× প্রচ্ছদ পাবনা-৪ উপনির্বাচন ঈশ্বরদী পাবনা জাতীয় রাজনীতি আন্তর্জাতিক শিক্ষাজ্ঞন বিনোদন খেলাধূলা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নির্বাচন কলাম ছবি ভিডিও রূপপুর এনপিপি
Smiley face করোনা ঈশ্বরদী পাবনা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা প্রযুক্তি বিনোদন শিক্ষা



লোকবল ও সরঞ্জাম ঘাটতি, বিপাকে বাংলাদেশ

দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড আইসিইউ বেড রয়েছে ১৯২টি। এর মধ্যে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে রয়েছে ২৬টি। তবে হাসপাতালটিতে বর্তমানে আইসিইউ বেড চালু রয়েছে ১০টি। দক্ষ লোকবল সংকটের কারণে বাকি ১৬টি বেড এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।
করোনাভাইরাসের জন্য দেশের ডেডিকেটেড প্রথম হাসপাতাল কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড আইসিইউ বেড রয়েছে ১৯২টি। এর মধ্যে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে রয়েছে ২৬টি আইসিইউ বেড। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাস্তবে হাসপাতালটিতে বর্তমানে আইসিইউ বেড চালু রয়েছে ১০টি। দক্ষ লোকবল সংকটের কারণে বাকি ১৬টি বেড এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। 

কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের এক চিকিৎসক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, আইসিইউ চালানোর জন্য ডাক্তার-নার্স, ওয়ার্ড বয়, ক্লিনার- কোনোটাই পর্যাপ্ত নেই। বর্তমানে চালু রাখা ১০ আইসিইউ বেডের জন্য ৯ জন চিকিৎসক রয়েছেন, যাদের ৪ জন এ সপ্তাহে জয়েন করেছেন। নার্স শুরুতে ১০ জন ছিলেন, এখন ২৭ জন। ১০ বেডের জন্য তা ঠিক, কিন্তু বাকি ১৬ বেড চালানো সম্ভব নয়।

যে ১০ জন চিকিৎসক রয়েছেন, তাদের মধ্যে ইনশিয়ালি পেশেন্ট ম্যানেজ করতে পারেন সাতজন। কিন্তু যেকোনো সিদ্ধান্ত নেন তিনজন ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তবে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি না থাকা। আউডসোর্সিংয়ের লোক নিয়েই কাজ চলছে।

আইসিইউতে এক শিফটে একজন ওয়ার্ড বয় ৮ থেকে ১০ জন রোগী দেখাশোনা করেন। পিপিই পরে তিন ঘণ্টার বেশি কাজ করা কঠিন; তাদেরও খুব কষ্ট হচ্ছে। আইসিইউর রোগীকে পাশ ফিরিয়ে দেওয়া বা অন্য কাজগুলো ঠিকমতো হচ্ছে না। লোকসংকটের কারণে সব বেড চালু করা যাচ্ছে না বলে অনেক রোগীকে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।

এছাড়া হাসপাতালটির আইসিইউতে ল্যাবরেটরি ফ্যাসিলিটিজ সংকট রয়েছে। প্রতি বেডে ইন্টারন্যাশনাল গাইডলাইন অনুসারে সিরিঞ্জ পাম্প (আইসিইউতে যে ওষুধ ব্যবহার করতে হয় তা খুবই অল্প অল্প করে দিতে হয়; যে ডিভাইস দিয়ে ওষুধ বা স্যালাইন দেওয়া হয়, তাকে সিরিঞ্জ পাম্প বলে) থাকতে হয় চারটি করে; কিন্তু এখানে রয়েছে একটি করে। দশ বেডের জন্য দশটি সিরিঞ্জ পাম্প রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ৪০টি প্রয়োজন। 

ওই চিকিৎসক জানান, আইসিইউতে ভেন্টিলেটর, ডায়ালাইসিস, প্রোটেবল এক্সরে মেশিন ব্যবহার করতে সমস্যা হচ্ছে ইলেকট্রনিক লাইনের সক্ষমতার কারণে। ইলেকট্রিক যে সাব-স্টেশন আছে, তা ২৬ বেডের আইসিইউ চালাতে পর্যাপ্ত না। সিটি স্ক্যান মেশিন যখন ব্যবহার করতে হয়, তখন হাসপাতালের একটা অংশের বিদ্যুৎ বন্ধ রাখতে হয়।

শুধু কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল নয়, কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালেও জনবল ঘাটতি ও লজিস্টিক সমস্যা রয়েছে। কুর্মিটোলা হাসপাতালের আইসিইউতে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন নেই। রোগীদের সিলিন্ডারের মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ করতে ভোগান্তিতে পড়ছেন চিকিৎসকেরা।

দেশে বর্তমানে কোভিড-১৯ রোগীর জন্য ডেডিকেটেড আইসিইউ বেড রয়েছে ১৯২টি। তবে দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে ১২০০টি আইসিইউ বেড রয়েছে। সেসব বেড পরিচালনার জন্যও দক্ষ জনবল ঘাটতি রয়েছে।

ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট সংকট

আইসিইউ পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত ডাক্তার ও নার্স প্রয়োজন। কিন্তু দেশে ২০০৮ সালে ক্রিটিক্যাল কেয়ার কোর্স চালু হলেও এখন পর্যন্ত ক্রিটিক্যাল কেয়ারের ওপর এমডি করেছেন মাত্র ৩০ জন চিকিৎসক, যেখানে প্রয়োজন কমপক্ষে ৬০০ জন। শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বারডেম ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিটিক্যাল কেয়ারের ওপর পোস্ট গ্রাজুয়েশন কোর্স চালু রয়েছে।

বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মোহাম্মদ ওমর ফারুক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, আইসিইউ পরিচালনার জন্য ক্রিটিক্যাল কেয়ারের ওপর প্রশিক্ষিত চিকিৎসক-নার্স প্রয়োজন। ১১ বছরে ক্রিটিক্যাল কেয়ারের ওপর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বের হয়েছেন মাত্র ৩০ জন। দেশে বছরে গড়ে ৩ জন করে চিকিৎসক ক্রিটিক্যাল কেয়ারের ওপর ডিগ্রি নেন। এটি প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।

ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিষয়ে প্রশিক্ষিত কোনো নার্স নেই। দেশে ক্রিটিক্যাল কেয়ারের ওপর নার্সদের পড়াশোনার সুযোগ নেই। আইসিইউতে যেসব নার্স ক্রিটিক্যাল কেয়ার সেবা দেন, তারা মূলত দেখে দেখে কাজ শিখেছেন।

অ্যানেস্থেমিওলজিস্ট সংকটও প্রকট

বাংলাদেশ সোসাইটি অব অ্যানেস্থিসিওলজিস্টের প্রেসিডেন্ট ডা. দেবব্রত বণিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, দেশে সরকারি পর্যায়ে যে আইসিইউগুলো রয়েছে, সেগুলো মূলত অ্যানেস্থেসিওলজিস্টরাই পরিচালনা করেন। সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল মিলিয়ে প্রশিক্ষিত অ্যানেস্থসিওলজিস্ট রয়েছেন আড়াই হাজার। অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের ঘাটতি অনেক দিনের। তবে করোনাভাইরাসের জন্য এখন বিভিন্ন জায়গায় আইসিইউ চালু করা হচ্ছে, তাই ঘাটতিটা বেশি চোখে পড়ছে। 

১১ বছর ধরে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়নি

বর্তমানে দেশের ২১টি ল্যাবে করোনাভাইরাস টেস্ট করা হচ্ছে। ৩০টি পিসিআর মেশিনে দিনে প্রায় ৫ হাজার নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা থাকলেও এখন পর্যন্ত দিনে তিন হাজার নমুনাও টেস্ট করা হয়নি। আবার যারা নমুনা সংগ্রহ করছেন, তাদের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যারা নমুনা সংগ্রহ করছেন, তাদের ঠিকমতো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। ফলে তারা ঠিকমতো নমুনা সংগ্রহ করতে পারছেন না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নমুনা যদি সঠিকভাবে সংগ্রহ করা না হয়, তাহলে টেস্টের রিপোর্ট ভুল আসবে। কিন্তু রোগী কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়বে। করোনা রোগী শনাক্তে প্রথম কাজ হলো প্রশিক্ষিত জনবল দিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, করোনা টেস্ট করতে নমুনা সংগ্রহ থেকে শুরু করে পিসিআর পরীক্ষা পর্যন্ত কতগুলো স্তর ঠিকমতো পালন করতে হয়। এজন্য স্কিল, ম্যানপাওয়ার ও সেটআপ প্রয়োজন। এ তিনটি জিনিস খুব কম ল্যাবে রয়েছে। যেখানে ভালো টেকনোলজিস্ট রয়েছেন, সেখানকার টেস্ট রিপোর্ট নির্ভরযোগ্য।

তিনি আরও বলেন, স্যাম্পল কালেকশন ও ল্যাবরেটরি টেস্ট- দুটি ক্ষেত্রেই ফ্রন্ট লাইনার টেকনোলজিস্ট। কিন্তু তাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না, ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে না। ১১ বছর ধরে দেশে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এ মুহূর্তে দেশে যে বিষয়টি জরুরি, তা হলো নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরি টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ৩০ হাজার মেডিকেল টেকনোলজিস্ট বেকার রয়েছেন। এর মধ্যে ১৫ হাজার ল্যাবরেটরি টেকনোলজিস্ট।

২০০৮ সালের পর দেশে সরকারি পর্যায়ে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ২০১৩ সালে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়ার জন্য একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে মামলা করা হয়। ওই মামলা এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে। বিচারাধীন একটি বিষয়ে এখন সরকার স্থায়ী মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দিতে পারবে না।

দেশের এ সংকটকালে ১৫ হাজার বেকার মেডিকেল টেকনোলজিস্টকে কাজে লাগানোর দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশেনের সাবেক মহাসচিব সেলিম মোল্লা। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, আদালতে মামলা থাকার কারণে টেকনোলজিস্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া থেমে আছে। কিন্তু ১৫ হাজার ল্যাবরেটরি টেকনোলজিস্ট বেকার রয়েছেন। এক্ষেত্রে সরকার যেকোনো প্রক্রিয়ায় তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে পারে।

তিনি বলেন, সরকারি পর্যায়ে যে লোকবল রয়েছে, তা দিয়ে এখন যে কয়টি সেন্টারে পরীক্ষা করা হচ্ছে, তারা হিমশিম খাচ্ছেন। ল্যাব যখন আরও বাড়ানো হবে, তখন পরীক্ষা করার লোকই পাওয়া যাবে না। 

তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রভাইডারদের দিয়ে নমুনা সংগ্রহের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা আত্মঘাতী। কারণ, চিকিৎসা সেবা সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নেই। নমুনা সংগ্রহ করা একটি জটিল প্রক্রিয়া। যিনি এ কাজটা করবেন, তাকে অ্যানাটমি-ফিজিওলজি জানতে হবে।

সেলিম মোল্লা বলেন, মানুষের নাক ও গলা থেকে নমুনা নিতে হয়। হেলথ কেয়ার প্রভাইডাররা জানেন না নাকের কোন অংশ বা গলার কোন অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হয়। এক ঘণ্টার ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ পদ্ধতির ট্রেনিং দেওয়া হলে যে কেউ সেটি করতে পারবে- বিষয়টি এত সহজ নয়।

কোন মন্তব্য নেই