× প্রচ্ছদ পাবনা-৪ উপনির্বাচন ঈশ্বরদী পাবনা জাতীয় রাজনীতি আন্তর্জাতিক শিক্ষাজ্ঞন বিনোদন খেলাধূলা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নির্বাচন কলাম ছবি ভিডিও রূপপুর এনপিপি
Smiley face করোনা ঈশ্বরদী পাবনা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা প্রযুক্তি বিনোদন শিক্ষা



করোনা আতঙ্ক ও একজন অভিভাবকের বিদায়

 সদ্য প্রয়াত শামসুর রহমান শরীফ এমপি’র স্মরণে
গোপাল অধিকারী
মানুষের জীবনে মৃত্যুটাই যেন স্বাভাবিক। বেঁচে থাকাটাই অস্বাভাবিক। যার জন্ম আছে তার মৃত্য হবেই এই বিশ্বাস নিয়েইু সকলকে বাঁচতে হয়। আর বেঁচে থাকতে যে যেমন কর্ম করে তাকে তেমনটাই মনে রাখে মানুষ। তাইতো বলা হয় কর্মই মানুষকে চিরদিন মনে রাখে। মানুষ বেঁচে থাকে না। তবে কিছু মৃত্যু আকস্মিক বা অসময়ের। তেমনি একটি ঘটনার জন্মদাতা শামসুর রহমান শরীফ এমপি। বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব করোনা ভাইরাসে আতঙ্কে আতঙ্কিত। অলস সময়ে কর্মহীন হয়ে মানুষ আজ দিশেহারা। ঠিক  সেই সময়ে ঈশ্বরদী-আটঘড়িয়ার মানুষকে ছেড়ে চলে গেলেন তিনি। মারা যাওয়ার পর সকল ব্যক্তিই যেন পরিপূর্ণতা পায়। তার কোন শত্রæ ছিল বা সে কোন মন্দ কাজ করেছেন এমনটা শোনাই দূরুহ। অথচ বেঁচে থাকতে আমরা কতটা নিষ্ঠুর হয়। কেউ মারা গেলে আমাদের মনে কিন্তু একটি ত্যাগ জন্ম নেয় যে একদিন মারা যাব কেন হিংসা-বিদ্বেষ বা শত্রæতা করব। কিন্তু কিছদিন না যেতেই আমরা আবার পুরোনো চেহারায় ফিরে যায়। ভুলে যায় মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করার প্রবণতা। আবার মৃত্যুর আগে যে ব্যক্তিটি মৃত্যুবরণ করেন হয়ত সেও তার মন্দকাজগুলো নিয়ে একই অনুশোচনা করে এই কাজটা যদি না করতাম ইত্যাদি ইত্যাদি। একজন মানুষ অপরজনের জন্য কতটা বটবৃক্ষ আমরা বেঁচে থাকতে কিন্তু সত্যিই বুঝি না বা বোঝার চেষ্টাও করি না। কিন্তু মারা যাওয়ার পর যখন বুঝি তখন করার কিছুই থাকে না। তেমনি একজন অভিভাবক শামসুর রহমান শরীফ ডিলু।  উত্তরবঙ্গের রাজনীতির এক উজ্জল বটবৃক্ষ। তার মত প্রবীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব উত্তরবঙ্গে কমই আছে। আমি এই বঙ্গের আরেকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের রাজনীতির সংবাদ দেখতাম তিনি হলেন বগুড়ার মমতাজ উদ্দীন। দীর্ঘদিন জেলা আওয়ামীলীগের হাল ধরে রেখেছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন বিএনপির চেয়্যারপার্সন খালেদা জিয়ার সাথে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেছেন কিন্তু জিতেছেন একবার। আর সেই মেয়াদেই তার মৃত্য হলো। তেমনি কয়দিন আগেই চলে গেলেন পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী-আটঘড়িয়া) আসনের সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শরীফ ডিলু এমপি। ২ এপ্রিল ২০২০ সালে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন । ১৯৪০ সালের ১০ মার্চ পাবনা জেলার সদর উপজেলার হেমায়েতপুর ইউনিয়নের চর শানিকদিয়ার গ্রামের মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণকারী এই  মানুষটি ছিল বণ্যার্ঢ্য জীবনের অধিকারী। পিতা লুৎফর রহমান এবং মাতা জোবেদা খাতুনের সন্তান। তার পৈর্তৃক নিবাস পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার ল²ীকুন্ডা ইউনিয়নের ল²ীকুন্ডা গ্রামে। তার শৈশব-কৈশোর কাটে ল²ীকুন্ডা ও পাবনা সদরে। শামসুর রহমান শরীফ লীকুন্ডা ফ্রী প্রাইমারি স্কুল ও পাকুড়িয়াা মিডল ইংলিশ স্কুলে পড়াশুনা শেষ করে পাবনা জেলা স্কুলে ভর্তি হন। ভারত বিভাগের পর নব্য স্বাধীন হওয়া পাকিস্থানে মাতৃভাষার দাবীতে আন্দোলন শুরু হয়। পূর্ব পাকিস্থানের জনগণ বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার দাবী জানায় ও আন্দোলন চালাতে থাকে। শামসুর রহমান শরীফ ভাষা আন্দোলনে যোগদান করেন। তখন তিনি পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। ভাষার দাবীতে মিছিল করায় তাকে পুলিশ গ্রেফতার করে ও জেলে বন্দী রাখে। পাবনা জেলার কতজন সেই সময়ে আন্দোলন করেছিলেন কারো জানা আছে কি? পাবনা জেলা স্কুল থেকে ১৯৫৭ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এরপর পাবনা এ্যাডওয়ার্ড কলেজ থেকে ১৯৬০ সালে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৬২ সনে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। ১৯৫৯ সালে আইয়ুব খানের মার্শাল ল' বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে গ্রেফতার হন। ১৯৬৭ সালে আবারও তিনি কারাবরণ করেন ছয় দফা আন্দোলনের প্রচার করতে গিয়ে। ১৯৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানে তার বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিলো। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ পাবনার মাধপুরে পাকিস্থানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। তার নেতৃত্বে তার বাহিনীর ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা গুলিতে মারা যায় এবং পাকিস্থানি সেনাদের অনেকেই ঐ যুদ্ধে হতাহত হয়।  তিনি ৭ নং সেক্টরের অধীনে কাজীপাড়ায় সেনাবাহিনীর ব্রিগেড লিডারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে তার প্রথমসাফল্য আসে ঈশ্বরদী উপজেলার লকিুন্ডা ইউনিয়নে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে। তারপরই তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনিতীতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি উক্ত ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে ক্রমান্বয়ে উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, সাধারন সম্পাদক, সভাপতি ও পরে ২০০৬ সালে জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মনোনীত হন এবং বর্তমানেও সভাপতির দায়ত্বে রয়েছেন । এর আগে তিনি ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তৎকালীন সরকারের আমলে টানা ৫ বছর কারারুদ্ধ ছিলেন এবং এরশাদ সরকারের আমলেও তাকে কারাবরণ করতে হয়। ঈশ্বরদীর কতজন নেতা এতবছর জেল খেটেছেন জানাতে পারবেন?  তিনি সর্বপ্রথম ১৯৭৯ সালে পাবনা-৪ আসনে আওয়ামীলীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং পরাজিত হন। পরে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে আবার পরাজিত হন। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তে পাবনা-৪ আসনে তাকে মনোনয়ন না দিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিববে মনোনয়ন দেয় আওয়ামীলীগ। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে দল তাকে মনোনয়ন দিলে বিপুল ভোটের ব্যবধানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০০১, ২০০৯, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একটি মানুষ সকলের কাছে মনমত হয় না বা হতে পারেও না। তাই শামসুর রহমান সবার কাছে প্রিয় ছিলেন না জানি। তবে কিছু মানুষ সত্যিকার অর্থেই সমালোচনা করে আর কিছু মানুষ নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে ঈর্ষা করে। তবে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে আমি তাঁকে পাবনা জেলার গর্ব বলেই দাবি করব। কারণ পাবনা জেলাতে হয়ত হাতে-গোনা কয়েকজন ব্যক্তিত্ব আছে যারা দেশের কাজে, আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে। তার সময়ের মত আন্দোলন বাংলাদেশে আর কোন দিন আসবে না আর সেই তীক্ত অভিজ্ঞতাগুলোকে কেউ অর্জনও করতে পারবে না। তিনি যে দীর্ঘদিন সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন এটিও গর্বের। বর্তমান যুগে একটি ইউপি সদস্য একবার জিতলে পরবর্তী মেয়াদে পরাজিত হয় সেখানে পাঁচ পাঁচবার মনোনয়ন যুদ্ধে ও ভোটে বিজয়ী হওয়া কম ব্যক্তিত্বের নয়। তার ব্যক্তিত্বে মন্ত্রীত্বের চেয়ার ঈশ্বরদী-আটঘড়িয়াতে আনতে পেরেছে। যদিও পরবর্তীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার অপরাধমূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত  হয়েছে। তবে অর্জনটা কিন্তু আগেই এসেছে। ভবিষ্যতে মন্ত্রীত্বের চেয়ার আসবে কি না সেটা নিয়েও আমি চিন্তা করি। আমি মনে করি যে যে দল বা গোষ্ঠীই করি না কেন বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের একমত হতে হবে। যে যে দলই করবে আমাদের এলাকাতে সরকারের একটি দায়িত্বশীল দায়িত্ব আনতে কাজ করতে হবে। আমি বড় কোন দলের নেতা বা সাংবাদিক নয় তবে একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমার কয়েকদিন সুযোগ হয়েছিল তার সামনে বসার। তাই মনে হলে বিশ্বাস করতে পারছি না তিনি বেঁচে নেই। মনে হচ্ছে সে মারা যাবে অথচ একটি রেশ থাকবে না এটা কি হতে পারে? কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস সারা দেশে যখন করোনা আতঙ্কে আতঙ্কিত তখনই তিনি চির বিদায় নিলেন। ফলে অনেকেই হয়ত দেখতে বা জানতেই পারেন নি তাদের অভিভাবক আর নেই। মানুষ দুঃসময়ে তার অভিভাবককে বেশি অনুভব করে। তাই এই সময় তার কথা সকলের মত আমরা যারা গণমাধ্যমে আছি তাদেরও আতঙ্ক কাটাতো। কিন্তু তিনি আর নেই। কয়েক দিনের সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি তিনি গভীর প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন। তাঁর অদূরদর্শীতা না থাকলে দীর্ঘদিন সংসদ সদস্য পদ ধরে রাখার ক্ষমতা কেমন করে হতো? আপনি আমি চেষ্টা করি দেখেনতো পারেন কি না? সে হয়ত সকলের অভিভাবক ছিলেন না বা সকলে অভিভাবক হিসেবে মানতে নারাজ তবে দেশের সংবিধান অনুযায়ী তিনি ছিল আমাদের অভিভাবক। ¯্রষ্টা হয়ত উত্তম মনে করেছেন তাই তাকে নিয়ে গেছেন পরপারে। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি। তবে তাঁর এভাবে চলে যাওয়া আমি আশা করি নাই। সে আমাদের জাতীয় নেতা । তার মৃত্যুতে লক্ষ লক্ষ জনসাধারণ জানাযাতে অংশ নিবে। জাতীয় সংসদসহ কয়েক দফা জানাযা হবে, সকল মন্ত্রী বা হেবিওয়েট নেতারা থাকবে এটাই আমি ভাবতাম। ভাবতাম তার মৃত্যুতে শোক পালন করে কালো ব্যাজ পরবে ঈশ্বরদী-আটঘড়িয়ার জনসাধারণ। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তিনি কাউকে কোননপ্রকার কষ্ট করতে না দিয়ে নিরবেই চলে গেলেন। কারো অভাব কারো দ্বারা পূরণ হয় না। হয়ত সময়ের সাথে সাথে আমরা একসময় তাকে ভ’লে যাব। সেই সাথে তার অবর্তমানে যারা অবিভাবক হওয়ার দৌড়ে প্রতিযোগীতায় অবতীর্ণ হয়েছেন তারা দৌড়াবেন। তবে তাদের বলব তাঁর জীবনী থেকে রাজনৈতিক শিক্ষা নেওয়া দরকার। অবশ্যই তার অভাবটা পূরণ করা দরকার। সেই সাথে তার ভ’লগুলো সংশোধনের জন্য কাজ করা দরকার। তাঁর ভাল আদর্শগুলো লালন করা দরকার।  তবেই বাকি উদ্দেশ্য সফল হবে বলে মনে করি। সেই সাথে তাঁর অস্পূর্ণ কাজগুলো করার দৃঢ় প্রত্যয় থাকা প্রয়োজন বলে মনে করি। রাজনীতি করবেন রাজনৈতিক স্বার্থে, দল ও দেশের স্বার্থে। হিংসা বা ক্ষমতা অপব্যবহারের জন্য নয়। আমি চাই জাতীয় নেতা। জাতীয় নেতা হবেন সেই লক্ষ্যে কাজ করবেন নতুন অভিভাবক। আবারো জানাই শেষ শ্রদ্ধা হে প্রিয় সদ্য প্রয়াত অভিভাবক।

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

কোন মন্তব্য নেই