× প্রচ্ছদ পাবনা-৪ উপনির্বাচন ঈশ্বরদী পাবনা জাতীয় রাজনীতি আন্তর্জাতিক শিক্ষাজ্ঞন বিনোদন খেলাধূলা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নির্বাচন কলাম ছবি ভিডিও রূপপুর এনপিপি
Smiley face করোনা ঈশ্বরদী পাবনা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা প্রযুক্তি বিনোদন শিক্ষা



উজানে ফারাক্কা বাঁধ: পদ্মা নদীসহ খাল-বিল পানি শূন্য

দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গঙ্গা-পদ্মা ছাড়াও অন্যান্য ছোট ও মাঝারি ধরনের নদ-নদী শুকিয়ে গেছে। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় বর্তমান পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। পদ্মা নদীসহ খাল-বিল এখন পানি শূন্য। শুধু তাই নয় সংশ্লিষ্ট নদীর তীরবর্তী এলাকা পরিণত হয়েছে অনেকটাই মরুভূমিতে। গেল তিন দশক ধরে চলছে এই ধারাবাহিকতা।

ভারত গঙ্গার ওপর ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে ৪০ হাজার কিউসেক পানি হুগলী ও ভাগীরথী নদীতে সরিয়ে নেওয়া শুরু করে। এমনকি ফারাক্কার উজানে উত্তর প্রদেশ রাজ্যের কানপুরেও গঙ্গার ওপর আরও একটি বাঁধ নির্মাণ করে উত্তর প্রদেশ ও বিহারে সেচের জন্য প্রায় চারশত পয়েন্ট থেকে পানি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ পানির ‘ন্যায্য হিস্যা’ পাচ্ছে না। ভারত তার বহু সংখ্যক সেচ ও পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মূল গঙ্গা এবং এর উপনদীগুলোর ৯০ ভাগ পানি সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে নদীতে পানি প্রবাহিত হতে পারছে মাত্র ১০ ভাগ।

এক সময়কার ভরা যৌবনা পদ্মা এখন শুকিয়ে এখন ধুধু বালু চরে পরিণত হয়েছে। প্রমত্তা পদ্মার নেই আগের মতো জৌলুস। শুষ্ক মৌসুম শুরু হতেই নাব্য হারিয়েছে খরস্রোতা পদ্মা। পানি কমায় বাড়ছে চরের বিস্তৃতি। বর্ষা যাওয়ার পর রাজশাহীর পদ্মার বুকে জেগে উঠেছে বিশাল চর। শুধু রাজশাহী এলাকায় নয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাংখা পয়েন্ট থেকে পাবনার ঈশ্বরদী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় দুশো কিলোমিটার জুড়ে পদ্মা নদী এখন মরুময় ধুধু বালুচর। পদ্মার নদীর সাথে রাজশাহী অঞ্চলের খাল বিলও শুকিয়ে গেছে। শুকিয়ে গেছে পদ্মার শাখা, উপশাখা নদীগুলোও। এছাড়াও বারনই নদীসহ বেশ কিছু ছোট নদী এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। রাজশাহী মহানগরী থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দুরে সরে গেছে নদীর পানি। এমন পরিস্থিতির জন্য পরিবেশ ও নদী বাঁচাও আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ বলছেন ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মা নদীর এ দুরবস্থা।

পদ্মা নদী মরে যাবার কারণে বড়াল, মরা বড়াল, মুছাখান, ইছামতি, ধলাই, হুড়া সাগর, চিকনাই, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, ভৈরব, নবগঙ্গা, চিত্রা, বেতা কালিকুমার, হরিহর, কালিগঙ্গা, কাজল, হিসনা, সাগরখালি, চন্দনা, কপোতাক্ষ, বেলাবতসহ পঁচিশটি নদ-নদীর অস্তিত্ব এখন প্রায় বিলীন। এ সব নদীর সাথে সংযুক্ত এ অঞ্চলের বিখ্যাত কিছু খাল বিল রয়েছে। এরমধ্যে যেমন চলনবিল। চলন বিল রাজশাহী বিভাগের সর্বোচ্চ বিস্তৃত বিল হিসেবে পরিচিত। এছাড়াও রয়েছে বিল হালতি, হিলনা, মহানগর, বিলভাতিয়া, উথরাইল, খিবির বিল, চাতরা, মান্দার বিল, বিলকুমলী, পাতি খোলা, অঙ্গরা, চাঙ্গা, দিকমী, পারুল, সতী, মালসী, ছোনী, বাঘনদী, পিয়ারুল, মিরাট, রক্তদহ, কুমারীদহ, খুকসী, জবই বিল, বাঁধ বাড়িয়া গ্রামের বিল। এ সব বিল মুলত পদ্মাকে ঘিরেই এর সৌন্দর্য বিরাজ করে। কিন্তু শুষ্ক মওসুমের আগেই পদ্মার পানি শূন্য হয়ে পড়ায় এর প্রভাব পড়েছে এসব খাল বিলে।

নদী গবেষকদের সূত্রে প্রকাশ, সকল নদীর পানির উৎস হিমালয় থেকে। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকাবেষ্টিত আছে উল্লেখ্য ৫টি নদীর শাখা ও উপশাখা নদী দিয়ে। তবে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ পথে বিভিন্ন জেলা দিয়ে এসে শাখা-উপশাখা নদীর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলাকে বেষ্ঠিত করেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ দিয়ে পদ্মা নদী প্রবেশ করে রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এ নদীর দৈর্ঘ্য ৩৬৬ কিঃ মিঃ। এর গড় গভীরতা ৯৬৮ ফিট।

নদীর গতিপথে বাঁধ দিয়ে পানি আটকানোর প্রভাব সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট নদীর চলমান পানি প্রবাহও একটি প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক ঘটনা। যে কোন প্রাকৃতিক নিয়মে মানবসৃষ্ট বাধার কারণে স্বাভাবিক নিয়মে ব্যাঘ্যাত সৃষ্টি করা হলে এর একটা প্রভাব পড়বেই। নদীর গতিপথে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহে বাধার সৃষ্টি করা হলে স্বল্প মেয়াদী ও দীর্ঘ মেয়াদী প্রভাব পড়ে। স্বল্প মেয়াদী প্রভাবগুলোকে খুব সহজেই উপলব্ধি করা যায় এবং এগুলো প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান। যেমন, নদীর পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, চর জেগে ওঠা, মাছের বিচরণ কম পরিলক্ষিত হওয়া, নাব্যতা হ্রাস পেয়ে নৌ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়া, ঘন ঘন বাঁকের সৃষ্টি হওয়া, পানির স্বচ্ছতা হ্রাস পাওয়া, দূষণ বেড়ে যাওয়া, বসবাসকারী মাছসহ জলজ প্রাণীদের জীবনে হুমকি নেমে আসা, নদীকেন্দ্রিক সেচ কাজ ব্যাহত হওয়া, গতি পথে ও অববাহিকা অঞ্চলে পলিসহ তলানী অতিরিক্ত জমা হয়ে মাটির গুণাগুণ নষ্ট করা, অববাহিকা এলাকায় বালুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া প্রভৃতি।

মূলত নদীর তলদেশ ভরাট ও ফারাক্কার কারণে পানি শূণ্য হয়ে বালুর উচ্চতা বেড়ে গেছে। বর্ষা মওসুমে মাস তিনেকের জন্য নদীতে পানি থাকলেও সারা বছরজুড়েই তলানিতে থাকে পানি। পদ্মায় শেষ পর্যন্ত যে পানি থাকে কোনো কাজে লাগে না। বেশিরভাগ সময় একেবারে নাগালের বাইরে এ পানি অবস্থান করে। যা দিয়ে সেচের কাজও করতে পারে না কৃষকরা। এছাড়াও পানি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে জেলেদের একটি বড় অংশ বেকার হয়ে যায়। যারা নদীতে মাছ শিকার করে জীবীকা নির্বাহ করেন তাদের এখনই দুর্দিন শুরু হয়েছে।

নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন-এর সভাপতি এডভোকেট এনামুল হক বলেন, গঙ্গার পানি বণ্টনের সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রসহ অন্যান্য নদীর বিষয়ও আলোচনাভুক্ত করতে হবে। পানি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। এ নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের জনগণ জাতিসংঘের মাধ্যমে বিষয়টির সমতাভিত্তিক নিষ্পত্তির জন্য অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রয়েছে।

ভারত ফারক্কা বাঁধ নির্মানের পর থেকেই এর প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে বাংলাদেশের মানুষ। আজ ১৬ মে। ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চ দিবস আজ। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ফারাক্কাকেন্দ্রিক আন্দোলন করেছিলেন। ১৯৭৬ সালের সেই ঐতিহাসিক মিছিলের চুয়াল্লিশ বছর পরও ঐ বাঁধের অভিশাপ বুকে বয়ে বেড়াচ্ছে। আর একের একের পর এক ক্ষতির সম্মুক্ষিন হচ্ছে রাজশাহী অঞ্চলের মানুষ।

মওলানা ভাসানীর সেদিনের লং মার্চ ছিল বাংলাদেশে ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লাখো জনতার এক বজ্রনির্ঘোষ প্রতিবাদ। ১৯৭৬ সালের ১৬ মে রাজশাহীর মাদরাসা ময়দান থেকে লং মার্চ শুরু হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে গিয়ে শেষ হয়। এদিন রোববার সকাল ১০টায় রাজশাহী থেকে শুরু হয় জনতার পদযাত্রা। হাতে ব্যানার আর ফেস্টুন নিয়ে অসংখ্য প্রতিবাদী মানুষের ঢল নামে রাজশাহীর রাজপথে। পরদিন সোমবার সকাল ৮টায় আবার যাত্রা শুরু হয় শিবগঞ্জের কানসাট অভিমুখে। ভারতীয় সীমান্তের অদূরে কানসাটে পৌঁছানোর আগে মহানন্দা নদী পার হতে হয়। লাখ লাখ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেন এই লং মার্চে। তারা নিজেরাই নৌকা দিয়ে কৃত্রিম সেতু তৈরি করে মহানন্দা নদী পার হন।

কানসাট হাইস্কুল মাঠে পৌঁছানোর পর সমবেত জনতার উদ্দেশে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী তার জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। তিনি ভারতের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘তাদের জানা উচিত বাংলার মানুষ এক আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না। কারো হুমকিকে পরোয়া করে না।’

তিনি বলেন, ‘আজ রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কানসাটে যে ইতিহাস শুরু হয়েছে তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করবে।’ মওলানা ভাসানী এখানেই লংমার্চের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। এর প্রতিক্রিয়া হয় আন্তর্জাতিক মহলে।

কোন মন্তব্য নেই