× প্রচ্ছদ পাবনা-৪ উপনির্বাচন ঈশ্বরদী পাবনা জাতীয় রাজনীতি আন্তর্জাতিক শিক্ষাজ্ঞন বিনোদন খেলাধূলা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নির্বাচন কলাম ছবি ভিডিও রূপপুর এনপিপি
Smiley face করোনা ঈশ্বরদী পাবনা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা প্রযুক্তি বিনোদন শিক্ষা



খেলাঘরের জন্ম ইতিহাস

হাসানুজ্জামান
দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে গেল। একদিকে ভারত রয়ে গেল অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান মিলে পাকিস্তান তৈরী হলো। দুই পাকিস্তানের মধ্যে দূরত্ব ১২’শ কিলোমিটার। বৃটেনের ভাইসরয় ক্লিমেন্ট এ্যাটলীর লেবার সরকারের ভারতীয় প্রতিনিধি লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন ভারতবর্ষকে ধর্মীয় ভিত্তিতে পৃথক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেন। তার আগে ভারতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় ৩০ লাখ মানুষের প্রাণ ঝরে গেল। ভারতের নেতৃত্বে জহরাল নেহেরু  অপরদিকে পাকিস্তানের নেতৃত্বে আসলেন কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

পশ্চিমপাকিস্তানের শাসকবর্গ প্রথমেই পূর্বপাকিস্তানের জনগণের মৌলিক অধিকার ভাষার উপর আক্রমণ করলেন। তারা বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দুকে জাতীয় ভাষা করতে চায়। এই নিয়ে দুই পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। পূর্ব পাকিস্তানীরা তাদের দাবীতে অনড় থাকেন। পাকিস্তানীদের ভাষার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি চেতনার অভিষেক ঘটে। বাংলা ভাষার আন্দোলনকে ঘিরে পূর্বপাকিস্তানের জনগণ একাট্রা হয়ে যায়। একের পর এক পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকবর্গের বৈরী আচরণের কারণে পূবর্ পাকিস্তানের জনগণ মানসিকভাবে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যায়। ধর্মীয় চেতনা দিয়ে দুই পাকিস্তানকে এক ও অভিন্ন করে রাখার স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ নিজেদেরকে পৃথকভাবে ভাবতে শুরু করে। তাদের মধ্যে নব্য সাংস্কৃতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই  চেতনায় দ্রæতই বাঙালিরা এক ও অভিন্ন হয়ে ওঠে। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী ক্রমেই বাঙালিদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এদিকে ছাত্র-জনতা বাংলাভাষার দাবীতে রাস্তায় নেমে আসে। আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে বাঙালিরা। অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রæয়ারিতে  সরকারের নিপীড়নমূলক ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্র-জনতা রাজপথে মিছিল করে। শাসকবর্গের পুলিশ গুলি করে হত্যা করে এদেশের বীরজনতাকে। রক্তাক্ত হয় ঢাকার রাজপথ। এই রক্তাক্ত অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির মধ্যে নতুন করে মুক্তির আকাঙ্খা অর্থ্যাৎ তাদের মধ্যে স্বাধীনতার স্বপ্ন জেগে ওঠে। এই স্বপ্নকে সামনে এগিয়ে নিতে রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি সংস্কৃতি কর্মীরাও এগিয়ে আসে। সেই সময় আন্দোলকামী মানুষের মধ্যে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে ধর্মীয় আবেগ দিয়ে একটি জাতিকে অখন্ডরুপ দেয়া যায় না। কেননা একটি দেশে বহুধর্মের, বিচিত্র সংস্কৃতির মানুষ বসবাস করে। দেশের নাগরিক হিসেবে সকলেরই সমান অধিকার থাকার দরকার রয়েছে। জাতিকেও নাগরিকদের সেইভাবেই সস্মান জানাতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মধ্যদিয়ে দেশ ও নাগরিক এগিয়ে যাবে। এই ভাবধারায় সৃষ্টি করে অসাম্প্রদায়িক চেতনা। বাঙালি ছাত্র-জনতা এই অসাম্প্রদায়িক চেতনার আলোকে স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যায়। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে এ দেশের প্রগতিশীলমনা সংস্কৃতিকর্মী ও বুদ্ধিজীবীরা এগিয়ে আসে।

এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে ১৯৫১ সালের ১৭ মে প্রতিষ্ঠিত হয়‘ দৈনিক সংবাদ’ পত্রিকা। এ দেশের বুদ্ধিজীবীদের অসাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনার মুখপাত্র হিসেবে দৈনিক সংবাদ কাজ করতে থাকে। সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয় জহুর হোসেন চৌধুরীকে। কথা ওঠে দেশের শিশুদের কিভাবে আলোর পথে নিয়ে আসা যায়। শিশুদের কথা ভেবেই দৈনিক সংবাদের একটি পাতা শিশুদের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। শিশুদের বরাদ্দকৃত এই পাতার নাম দেয়া হয় ‘খেলাঘর’। এই খেলাঘর পাতা ভরে উঠবে শিশুদের লেখায়। লেখার মধ্যে থাকবে কবিতা, ছড়া, গল্প, রম্য রচনাসহ নানা কিছু। ১৯৫২ সালের ২ মে থেকে প্রকাশিত শুরু হয় শিশুদের জন্য ‘খেলাঘর’ পাতা। এই খেলাঘর পাতার মূল দায়িত্বটি পালন করতে থাকেন কবি হাবিবুর রহমান। তিনি ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক চেতনার খাঁটি বাঙালি প্রেমিক মানুষ। তার অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতায় ‘খেলাঘর’ পাতা ঘিরে একটি লেখক গোষ্ঠী তৈরী হয়। এই লেখক গোষ্ঠী শুধুমাত্র ঢাকা কেন্দ্রিক নয় ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। এই লেখক গোষ্ঠীর মধ্যে ছিলেন ছড়াকার ফয়েজ আহমদ, আবুল কালাম মজ্ঞুর মোর্শেদ, ছড়াকার রফিকুল হক, কবি আল মাহমুদ, শিশু সাহিত্যিক আল কামাল আবদুল ওহাব, মিজানুর রহমান শেলী, মুসাউর রহমান, কবি ওমর আলী, দীন মোহাম্মদ নবী, আব্দূর নূর প্রমূখ। সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার বের হতো ‘খেলাঘর’ পাতা। ২৬৩, ঢাকার বংশাল রোডের দৈনিক সংবাদের‘ খেলাঘর’ পাতাকে কেন্দ্র করে লেখকদের আনোগোনা আগের চেয়ে আরো বেড়ে যায়।  লেখকদের একটি সাংগঠনিক ফ্রেমে কিভাবে নিয়ে আসা যায় তা নিয়ে কবি হাবিবুর রহমানসহ খেলাঘর পাতার শুভাকাঙ্খীরা বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তারা দৈনিক সংবাদ অফিসের দোতলার একটি কক্ষে মিটিং ডাকলেন। সেই দিনকার সেই মিটিং এ উপস্থিত ছিলেন আল কামাল আব্দুল ওহাব, আব্দুর নূর, দীন মোহাম্মদ নবী, তসলিম উদ্দিন আহমেদ, গোলাম মোহাম্মদ মাস্তানা, গোলাম হাক্কানী খান, হাবিবুর রহমান মল্লিক, মাসুদ আহমেদ, যদুনাথ রায়, তৎনীল কুমার দে, বজলুর রহিম, মুসাউর রহমান, মোস্তফা কামাল, ইমরুল চৌধুরী, শুভ রহমান। মিটিং এর এক পর্যায়ে এসে উপস্থিত হলেন রণেশ দাশ গুপ্ত, সানাউল্লা নূরী ও শহীদ সাবের। মিটিং এর মাধ্যমে ‘খেলাঘরকে’ একটি সাংগঠনিক রুপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। একই সাথে ‘খেলাঘরের’ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয় শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো।
কবি লেখকরা সারা দেশে ‘খেলাঘরের’ শাখা খুলতে  ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ‘খেলাঘরের’ নিবেদিত কর্মী দীন মোহাম্মদ নবী ও গোলাম মোহাম্মদ মাস্তানার উদ্যোগে ঢাকার জেলখানা রোডে ‘খেলাঘরের’ প্রথম শাখার উদ্বোধন করা হয়। শাখাটির নামকরণ করা হয় ‘আমাদের খেলাঘর’। তারপরে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ময়মনসিংহে হুল্লোড় খেলাঘর, খুলনার দৌলতপুরে মুকুল খেলাঘর, চট্রগ্রামে আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ খেলাঘর আসর গঠন করা হয়। এভাবেই মাত্র দ’ুবছরের মাথায় সারাদেশে ২৪টি শাখা আসর গড়ে ওঠে। সংগঠন বিস্তৃতি লাভ করতে থাকলে একটি কেন্দ্রিয় কমিটি গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আসে খেলাঘরের সম্মেলন। এই সম্মেলনে সম্পন্ন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ‘খেলাঘর’ কেন্দ্রিয় কমিটি গঠন করা হয়। ‘খেলাঘর’ কেন্দ্রিয় কমিটির প্রথম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয় আল কামাল আব্দুল ওহাব, প্রধান উপদেষ্টা ও কোষাধ্যক্ষ পদে কবি হাবিবুর রহমান, সভাপতি সৈয়দ নূর উদ্দিন, সহ-সভাপতি: অধ্যাপিকা আফিয়া খাতুন ও মুহাম্মদ সফিয়ুল্লাহ, সহ-সাধারণ সম্পাদক  মোহাম্মদ রেজাউর রহমান, শওকত আরা বেগম, গোলাম হাক্কানী খান, প্রচার সম্পাদক আবুল কালাম মজ্ঞুর মোর্শেদ, সহকারী প্রচার সম্পাদক মুহাম্মদ রেজাউর রহমান(২) সদস্য তসলিম উদ্দিন আহমেদ, গোলাম মোহাম্মদ মাস্তানা, হাবীবুররহমান মল্লিক, আনোয়ারুল হক। কিছুদিনের মধ্যে এই কার্যকরি পরিষদে আরো পাঁচজনকে কো-অপ্ট করা হয় এবং তাদের মধ্যে নিন্মলিখিতভাবে দায়িত্ব বন্টন করা হয়। সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে বেগম নাজমা চৌধুরী, সংগঠক পদে মুহম্মদ নূরুল ইসলাম, সদস্য পদে আজমা চেীধুরী ও মিজানুর রহমান শেলীকে অর্ন্তভুক্ত করা হয়। নতুন কমিটি তিনটি কাজকে মুল কাজ হিসাবে গ্রহণ করে। 
১। কেন্দ্রিয় ‘খেলাঘরের’ উদ্যোগে নিয়মিত মাসিক সাহিত্য সভার আয়োজন। 
২। ‘খেলাঘর’ পাতার লেখকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ
৩। পাতার জন্য সাহিত্যসভাসহ বিভিন্ন কর্মকান্ডের রিপোর্ট তৈরী। 

১৯৫৭ সালের দিকে  ‘খেলাঘরের’ উদ্যেক্তা কবি হাবিবুর রহমান দৈনিক সংবাদ ছেড়ে দিয়ে ‘ইউসিস’ (আমেরিকা ইনফর্মেশন সার্ভিস) এ যোগদান করেন। এদিকে কমিটির এক বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে আসলে পুনরায় নতুন কমিটি গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ফলে ১৯৫৭ সালের জুন মাসে বাংলা একাডেমীর মিলনায়তনে সাধারণ সভায় মুহাম্মদ সফিউল্লাহ (ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ’র সন্তান) নতুন কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হয়। 
এদিকে ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পূর্বপাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করা হয়। সামরিক শাসক আউয়ুব খান সর্বোময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে দেশ চালাতে থাকেন। এ সময় দেশবাসীর মনে নানা রকম আশংকা ভর করতে থাকে। সামরিক শাসনের গতিবিধি সম্পর্কে এ দেশের নিরীহ মানুষের কোনো ধারণা ছিল না। ‘খেলাঘরের’ সমস্ত কর্মকান্ড বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে কবি হাবিবুর রহমান দৈনিক সংবাদের খেলাঘর পাতার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে দৈনিক আজাদের শিশুদের পাতা “ মুকুলের মাহফিল” দেখার দায়িত্ব নিলেন। 

১৯৫৯ সালের জুন মাসে ‘খেলাঘরের’ দায়িত্ব পান আনোয়ার জাহিদ। গঠন করা হয় একটি অর্ন্তবর্তীকালিন কমিটি। এই কমিটির আহবায়ক ছিলেন হেদায়েত হোসাইন মোরশেদ এবং যুগ্ম আহবায়ক ছিলেন হাবিবুর রহমান মল্লিক ও মুসাউর রহমান। অনেক চরাই-উৎরাই পেরিয়ে অবশেষে পুনরায় খেলাঘর আন্দোলন শুরু হলে আবারো কেন্দ্রিয় সম্মেলনের প্রয়োজন দেখা দেয়। বাংলা একাডেমী মিলনায়তনে ১৯৬৭ সালের ৫ মার্চ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে ২০টি শাখা অংশগ্রহণ করে। এই সম্মেলনে প্রথম ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র তৈরী করা হয়। সম্মেলনের উদ্বোধন করেন বেগম ফিরোজা বারী। সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচিত  করা হয় কবি জসিম উদ্দিনকে। অন্যান্য উপদেষ্টারা হলেন সত্যেন সেন, পটুয়া কামরুল হাসান, রণেশ দাশগুপ্ত ও শহীদুল্লা কায়সার। সভাপতি বজলুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক পদে নিয়ামত হোসেনকে নির্বাচিত করা হয়। ১৯৭০ সালের ১৫ মার্চ আবারো ‘খেলাঘরের’ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে বজলুর রহমান সভাপতি এবং জিয়াউদ্দিন আহমেদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়। 

পরের বছর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকবাহিনী নিরীহ বাঙালির উপর আক্রমণ শুরু করলে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মাত্র নয় মাসের মাথায় পাকবাহিনী আত্বসর্মপণ করে পালিয়ে যায়। দেশ স্বাধীন হয়। মহান এই  মুক্তিযুদ্ধে খেলাঘরের অনেক বন্ধু সরাসরি অংশ গ্রহণ করে। এই বীর যোদ্ধাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন খেলাঘর কেন্দ্রিয় কমিটির সভাপতি বজলুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দিন আহমদ, সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন জালাল, সাংস্কৃতিক সম্পাদক মেহেদী হাসান, পাঠাগার সম্পাদক আলতাব আলী হাসু, সহ-দপ্তর সম্পাদক আব্দুল আজিজ, সদস্য অমলনাথ, খেলাঘর কর্মী মোঃ শহীদুল্লাহ সাউদ প্রমূখ। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন ‘খেলাঘর’ কেন্দ্রিয় কমিটির উপদেষ্টা শহীদুল্লাহ কায়সার, সদস্য আবম বদিউজ্জামান, মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ সাউদ, গাজী আব্দুল হোসেন, আরতি দত্ত, সিদ্ধার্থ সেন, অতনু বিশ্বাস, এহসান কবির রমজান, গঙ্গোত্রী কুমার শর্মা প্রমূখ। মুক্তিযুদ্ধে ‘খেলাঘরের’ অংশগ্রহন খেলাঘরকে যেমন সন্মানিত করেছে। অপরদিকে ‘খেলাঘরের’ ক্ষতির পরিমাণও কিন্তু কম নয়। স্বাধীনতা বিরোধীরা সারাদেশে খেলাঘর কর্মীদের বাড়ীঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। তরপরেও খেলাঘর কর্মীদের জন্য বড় তৃপ্তি একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছে তারা। সারা বিশ্বে বাংলাদেশ এখন একটি পরিচিত নাম। স্বাধীন দেশে খেলাঘর আন্দোলন আবারও জোরেসোরে চলতে থাকে। ১৯৭২ সালে খেলাঘর বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান করে। যেমন  সাহিত্য বাসরের সূবর্ণজয়ন্তি উদযাপন, সপ্তাহব্যাপী একুশ উদযাপন, নববর্ষ উদযাপন, প্রতিষ্ঠাবাষির্কী পালন, আর্ন্তজাতিক শিশুদিবস উদযাপন, কর্মসূচির মাধ্যমে খেলাঘর শুধু দেশের মধ্যেই নয় বিদেশেও ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। পরে এই শিশু সংগঠন ‘খেলাঘর’ আর্ন্তজাতিক শিশু সংগঠন সিমিয়ার সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করে। উল্লেখ্য যে, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এই ‘খেলাঘর’ প্রথম  আর্ন্তজাতিক সংগঠনের সদস্য পদ পাওয়ার গৌরব অর্জন করে । সদস্য প্রাপ্তির পর থেকে ‘খেলাঘর’ বেশ কিছু আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে অনুষ্ঠিত শিশু উৎসবে অংশ গ্রহন করার দূর্লোভ সূযোগ অর্জন করে। 

১৯৭৩ সালের স্বাধীন দেশের মাটিতে খেলাঘরের সম্মেলন করার সূযোগ পায়। এই সম্মেলনটি ছিল নানা দিকদিয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ। একদিকে যুদ্ধে কর্মী হারানোর বেদনা অপরদিকে নতুন দেশ পাওয়ার এক অনাবিল আনন্দ। এই আনন্দঘন পরিবেশে ইজ্ঞিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত হয় ‘খেলাঘর’ সম্মেলন। এই সম্মেলনে সারা দেশ থেকে ‘খেলাঘরের’ ৫৪ টি শাখা আসর অংশ গ্রহণ করে। সম্মেলনে শিশুদের র‌্যালি, আনন্দ শোভাযাত্রায় এক নতুন মাত্রা  এনে দেয়। সম্মেলনে ১৭ সদস্যের একটি কেন্দ্রিয় কমিটি নির্বাচিত করা হয়। এই কমিটিতে সাধারণ সম্পাক নির্বাচিত হয় জিয়াউদ্দিন আহমেদ। উপদেষ্টারা হলেন: সত্যেন সেন, রণেশদাশ গুপ্ত, কবির চৌধুরী,অধ্যাপক আব্দুল হালিম, অধ্যাপক পান্না কায়সার, বেগম শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী,  শিল্পী রফিকুন্নবী। সভাপতি মন্ডলির সদস্য নির্বাচিত হয় বজলুর রহমান, শওকত আনোয়ার ও সাইদুর রহমান। এ কমিটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে সাহিত্য পত্রিকা ‘খেলাঘর সন্দেশ’ প্রকাশিত হয়। 

১৯৭৫ সালে  ১৫ আগষ্ট এক সেনা অভ্যৎত্থানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবারসহ নিহত হয়।এ ঘটনার পর  অনেকেই মনে করেছিলেন  এ অবস্থায় ‘খেলাঘর’ বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু দেখা গেছে এই বৈরী পরিবেশে ‘খেলাঘর’ আন্দোলন আরো বেগবান হয়েছে। জেলা কমিটি হয়েছে অনেকগুলি। সারা দেশে প্রায় পাঁচ শত খেলাঘর শাখা গড়ে উঠেছে। এ সময় দেশের সুস্থধারার সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে ‘খেলাঘর’। ১৯৭৬ সালের ২৪-২৫ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক মিলনায়তনে দুইদিন ব্যাপী খেলাঘর কেন্দ্রিয় কমিটির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে ২৫ সদস্য বিশিষ্ঠ একটি কেন্দ্রিয় কমিটি গঠন করা হয়। এই সম্মেলনে সভাপতি বজলুর রহমন এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয় সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ। ১৯৭৯ সালের ১৩-১৪ অক্টোবর কেন্দ্রিয় কমিটির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে বজলুর রহমান চেয়ারম্যান এবং জহুরুল আলম ঝরা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়। ১৯৮০ সালে ‘খেলাঘর’ দাবা প্রতিযোগিতা, জাতীয় নাট্য প্রতিযোগিতা, সপ্তাহব্যাপী জাতীয় বিজ্ঞানমেলার আয়োজন ছিল ‘খেলাঘরের’ বিশেষ একটি দিক। ১৯৮২ সালের জাতীয় সম্মেলনে বজলুর রহমান চেয়ারম্যান এবং কামাল চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়। এ সময় নানা কারণে সংগঠনের গতি মন্থর হয়ে যায়। বিশেষ করে বজলুর রহমানের অন্য কাজে ব্যস্ত থাকা এবং সংগঠনে সময় না দেওয়ার কারণে সংগঠনের প্রভূত ক্ষতি হয়। ১৯৮৬ সালের ২৭-২৮ ফেব্রয়ারি বাংলাদেশ শিশু একাডেমীতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ড. আলী আসগরকে চেয়ারম্যান এবং তাহমিনা সুলতানা স্বাতীকে সাধারণ সম্পাদকের জন্য নির্বাচিত করা হয়। ১৯৮৮ সালে তাহমিনা সুলতানা স্বাতী তার পদ থেকে পদত্যাগ করলে সেখানে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আব্দুল আজিজকে অর্ন্তভুক্ত করা হয়। ১৯৯২ সালে ‘খেলাঘর’ সংগঠনের মধ্যে নানা উপদলীয় কোন্দলের সৃষ্টি হয। এ সময়ের সম্মেলনে একদিকে চেয়ারম্যান পদে ড.আলী আসগর এবং সাধারণ সম্পাদক পদে আব্দুল আজিজ নির্বাচিত হয়। অপরদিকে একটি ক্ষুদ্র অংশ ‘খেলাঘরের’ অপর একটি সম্মেলনের মধ্য দিয়ে অধ্যাপিকা পান্না কায়সারকে চেয়ারম্যান এবং প্রণয় কুমার সাহাকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৯৯৯ সালের ‘খেলাঘরের’জাতীয় সম্মেলনে ড. আলী আসগর চেয়ারম্যান এবং জিয়াউদ্দিন আহমেদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়। ২০০২ সালের সম্মেলনে ড.আলী আসগর সভাপতি এবং মোখতার হোসেন হৃদয় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়। ২০০৫ সালের সম্মেলনে ড. আলী আসগরকে চেয়ারম্যান এবং ডা. লেলিন চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ২০০৯ সালের জাতীয় সম্মেলনে প্রফেসর মাহফুজা খানমকে চেযারপার্সন এবং ও ডা. লেলিন চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ২০১২ সালের জাতীয় সম্মেলনে প্রফেসর মাহফুজা খানমকে চেয়ারপার্সন এবং মোকলেছুর রহমান সাগরকে সাধরণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ২০১৭ সালের বাংলাদেশ শিশু একাডেমেিত অনুষ্ঠিত জাতীয় সম্মেলনে প্রফেসর মাহফুজা খানম সভাপতি এবং জহিরুল ইসলাম জহিরকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ২০১৯ সালে সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম জহির পদত্যাগ করলে মোঃ রুনু আলীকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। 

দৈনিক সংবাদের ‘খেলাঘর’ পাতা প্রকাশের পর ঢাকা থেকে প্রকাশিত আরো কয়েকটি দৈনিক পত্রিকা শিশুদের সাহিত্যকর্ম প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই পত্রিকাগুলোর মধ্যে উল্লেখ্য হলো দৈনিক আজাদের মুকুলের মাহফিল, দৈনিক ইনসাফের মুকুলের মজলিস, মিল্লাতে কিশোর দুনিয়া উল্লেখযোগ্য। কিন্তু পরবর্তীতে দৈনিক সংবাদের ‘খেলাঘর’ পাতা থেকে সাংগঠনিক রুপ পেয়ে শিশু সংগঠন হিসেবে দাড়িয়ে গেছে। আজকে দেশের এবং দেশের বাইরেও জাতীয় শিশু কিশোর সংগঠন ‘খেলাঘরের’ পরিচিতি কম নয়। সারা দেশে ৫’শ এর উপরে ‘খেলাঘরের’ শাখা কাজ করছে। অপর দিকে অন্যান্য পত্রিকার সাথে সংশ্লিষ্ট শিশুতোষ পাতাকে সাংগঠনিক রুপ দিতে পারেনি। তবে ‘খেলাঘরের’ সাথে সাথে কচিকাঁচার মেলা, মুকুল ফৌজ, সবুজ সেনা কিছুদিন কর্মকান্ড চালালেও বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি। 

লেখকঃ সদস্য, খেলাঘর কেন্দ্রিয় কমিটি,
মোবাঃ ০১৭১১-১০৮৭৩৬

সূত্রঃ 
১।সুন্দর আগামীর সন্ধানে- রথীন সেন,প্রেসিডিয়াম সদস্য, খেলাঘর কেন্দ্রিয় কমিটি। 
২। আব্দুল আজিজ - সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বক্তব্য থেকে তথ্য সংগৃহিত।
৩। ডা. লেলিন চৌধুরী - প্রেসিডিয়াম সদস্য,খেলাঘর কেন্দ্রিয় কমিটি।বক্তব্য থেকে  তথ্য সংগৃহিত।
৪। মোখলেছুর রহমান সাগর- প্রেসিডিয়াম সদস্য, খেলাঘর কেন্দ্রিয় কমিটি।বক্তব্য থেকে তথ্য সংগৃহিত।

কোন মন্তব্য নেই