× প্রচ্ছদ পাবনা-৪ উপনির্বাচন ঈশ্বরদী পাবনা জাতীয় রাজনীতি আন্তর্জাতিক শিক্ষাজ্ঞন বিনোদন খেলাধূলা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নির্বাচন কলাম ছবি ভিডিও রূপপুর এনপিপি
Smiley face করোনা ঈশ্বরদী পাবনা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা প্রযুক্তি বিনোদন শিক্ষা



৫০০ টাকায় শুরু, অনলাইনে ছাতু বেঁচে লাখপতি ঈশ্বরদীর মেয়ে নিপা


বর্তমান সময়টি অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং কারণ এটি আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। মুহূর্তের মধ্যেই সবকিছু পাল্টে যাচ্ছে। ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত ও গতিশীল হচ্ছে। নারী আর পুরুষের মধ্যকার ভেদাভেদ দূর হচ্ছে। পুরুষের পাশাপাশি তাল মিলিয়ে নারীরাও কর্মক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছেন।

একবিংশ শতাব্দীর নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাধা পেরিয়ে নারীরা সমাজে মর্যাদার স্থানে প্রতিষ্ঠিত হতে সর্বদা সচেষ্ট। তবে এ জন্য নারীদের স্বাবলম্বী হতে হবে, হতে হবে আত্মনির্ভরশীল। আর স্বাবলম্বী হওয়ার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা। ই-কমার্স ব্যবসায়ে বাংলাদেশ খুব দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখনই ই-কমার্স ব্যবসা শুরু করার সঠিক সময়।

সম্প্রতি বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই সবকিছুই করে দেয়া হয়েছিল বন্ধ বা লকডাউন। যার পেছনের কারণ চলমান বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ বা নোভেল করোনা ভাইরাস। এতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ও কর্মকাণ্ডে আসে অমূল পরিবর্তন। এমন সময় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও চাহিদা ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে অনলাইন বা ই-কমার্স বিজনেসের।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশ থেকেও লকডাউন তুলে নেওয়া হয়েছে। তবুও লকডাউনে পরিবর্তিত জীবনযাত্রা ও কর্মকান্ডে অনেকেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে অনলাইন বা ই-কমার্স ব্যবহারের দিকেই ঝুঁকেছেন প্রায় সবাই। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের কিছু তরুণ উদ্যোক্তারা ব্যতিক্রমী ও বৈচিত্র্যময় স্বদেশি পণ্য নিয়ে অনলাইন বা ই-কমার্স বিজনেস প্লাটফর্মে এসে নিজস্ব পরিচয় সৃষ্টির স্বপ্ন দেখছেন।

তেমনিভাবে নিজেকে স্বাবলম্বী করে নিজস্ব পরিচয় সৃষ্টির স্বপ্ন দেখেছেন বরেন্দ্র অঞ্চলের ঈশ্বরদী থানার তরুণী নিপা সেনগুপ্ত (২৩)। জনপ্রিয় অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ফেসবুক’-এ ছাতুর অনলাইন ব্যবসা করার প্রচেষ্টা করেন।

চলতি বছরের শুরুর দিকে ‘ঐতিহ্যবাহি কৃষির অমৃত স্বাদ’ নামে তিনি ফেসবুকে একটি পেজ খুলেন। সেখানে-ই তার অনলাইন ব্যবসার যাত্রা শুরু করেন। প্রথম দিকে অনলাইনে তেমন সাড়া না পেলেও অফলাইনে পরিচিত আত্মীয়-স্বজন আর বন্ধু বান্ধবের কাছে বিক্রি করতেন তার পণ্য। তবে ‘উই’ এ যুক্ত হওয়ার পরে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।

স্বদেশি পণ্য নিয়ে অনলাইন বা ই-কমার্স বিজনেস শুরু করা উদ্যোক্তাদের সংগঠিত করে ব্যবসা প্রসারিত করতে গড়ে উঠেছে নানা অনলাইন প্লাটর্ফম। বিশেষত নারীদের জন্য তেমন-ই একটি প্ল্যাটফর্ম ‘উইমেন এন্ড ই-কমার্স ফোরাম’। যা মূলত ‘উই’ নামে পরিচিত। যা ইতিমধ্যেই বর্তমান সময়ের দেশি পণ্য কেনাবেচার সবচেয়ে বড় অনলাইন প্লাটফর্মে পরিণত হয়েছে। যেখানে সমগ্রদেশের ঐতিহ্যবাহী স্বদেশি প্রায় সকল ধরণের পণ্য সর্বদাই পাওয়া যায়। আর বর্তমানে এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সদস্য সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।

ঠিক নামের সাথে তাল মিলিয়ে-ই ‘উই’ লাখ লাখ নারীকে সফল উদ্যোক্তা হতে সহযোগিতা করছে। সবাই এখন উই থেকে সফল উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। উদ্যোক্তা নিপা সেনগুপ্ত (২৩) তার অনলাইন ব্যবসা চলতি বছরের প্রথম দিকে শুরু করলেও উইতে যুক্ত হোন চলতি বছরের ১৪ জুন।

অনলাইনের ব্যবসা সম্পর্কে অল্প বিস্তর পূর্বের ধারণা বা জ্ঞান থাকলেও উইয়ের কর্নধার রাজীব আহমেদ ও নাসিমা আক্তার নিশার কাছে ‘ই-কমার্সে হাতেখড়ি’ হয় নিপার। এরপর নিপা নতুন উদ্যোমে কাজ শুরু করেন বরেন্দ্র অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী যবের ছাতু ও যবের আটা নিয়ে। যব বিলুপ্তপ্রায় কৃষি পন্য এবং গুনগতমান সম্পূর্ণ খাদ্য ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ হওয়ার কারনে প্রথম থেকেই উই গ্রুপে ভালো সাড়া আসতে থাকে।

ঈশ্বরদীতে বাবার বাড়ি আর নাটোর বনপাড়া শশুড় বাড়ি হলেও স্বামীর চাকরি আর নিজের পড়াশোনার সূত্রে নিপার রাজশাহীতে থাকা। অতীত থেকেই রাজশাহীর অঞ্চলে যবের চাষ হয়ে আসছে। ফলে এখনও গ্রামের অনেক কৃষক যবের চাষ করে থাকে। ফলে ছাতুর প্রধান উপকরন যবের প্রাপ্ততাও ভালো। আবার এ অঞ্চলের নারীরা যবের ছাতুও তৈরি করতে পারে উন্নত মানের।

রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজের ইতিহাস বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নিপা সেনগুপ্ত। তার স্বামী অমৃত কুমার সরকার কৃষি গবেষণা সংক্রান্ত চাকরি করেন। সেই সুবাদে নিপার কৃষি নির্ভর পণ্যের ব্যবসা করা সহজ হচ্ছে।

নিপা সেনগুপ্ত ই-কমার্সে কাজ শুরু করেন মাত্র পাঁচশ টাকা মূলধন নিয়ে। উই গ্রুপের নিয়ম মেনে চলতে থাকে পরিচিতি বাড়ানোর কাজ। পাশাপাশি অল্পবিস্তর অর্ডার প্রাপ্তি। আস্তে আস্তে পরিচিতি বৃদ্ধি হতে থাকে। আসতে থাকে পণ্যের পজেটিভ রিভিউ।

এরপর কাস্টমারের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে পণ্যের তালিকায় যুক্ত করেন যব, গম, চাল, মসুর ও ছোলার সংমিশ্রণে পঞ্চ-ব্যাঞ্জন ছাতু। এটাও এ অঞ্চলের ঐতিত্যবাহী খাবার। গম, যব, পাঁচ মিশালী ও পঞ্চ-ব্যাঞ্জন ছাতু রকমভেদে প্রতিকেজি দুই‘শ আশি টাকা থেকে চার‘শ টাকা দরে বিক্রি করেন তিনি।

এরপর ধীরে ধীরে একে একে তার পণ্যের তালিকায় যুক্ত হতে থাকে নানা রকমের স্বদেশি কৃষিজাত ভেজালমুক্ত পণ্য। নিপার ‘ঐতিহ্যবাহি কৃষির অমৃত স্বাদ’ নামে অনলাইন ব্যবসার পণ্যের তালিকায় বর্তমানে রয়েছে গম, যব, পাঁচ মিশালী ও পঞ্চ ব্যাজ্যন ছাতু এবং লাল গম, মাসকালাই ও যব এই তিন প্রকারের আটা। এছাড়াও রয়েছে ভেজালমুক্ত আখের গুড়, কালোজিরা, দেশি ধানের চাল, বিলুপ্তপ্রায় ফলজ চারা, পাবনা বিখ্যাত ঘি এবং বিভিন্ন পদের মৌসুমি আচার। রাজশাহী শহরের ভিতরে ফ্রি হোম ডেলিভারি ও দেশের যেকোনো প্রান্তে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পণ্য সরবরহ করে থাকেন এই নারী উদ্যোক্তা।

‘উইমেন এন্ড ই-কমার্স ফোরাম-উই’তে যুক্ত হওয়ার তিন মাসের মধ্যে সকল পণ্য মিলিয়ে নিপা সেনগুপ্তর আয় হয়েছে প্রায় এক লাখ পাঁচ হাজার টাকারও উপরে। এর সাথে সাথে গ্রুপে পরিচিতিও বেড়েছে।

এ বিষয়ে সফল তরুণ নারী উদ্যোক্তা নিপা সেনগুপ্ত বলেন, ‘আমি অনার্স চতুর্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা দিচ্ছিলাম। পাঁচটি পরীক্ষাও শেষ হয়েছিল। এরমধ্যেই করোনা মহামারির কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। আর আমিও বাসায় বন্দী হয়ে গেলাম। সারাদিন বসে বসে দিন কাটছিলো এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে উই গ্রুপে যুক্ত হই। এরপর এখান কার নারীদের কাজ দেখে আমি অভিভুত হয়ে যাই।’

এই সফল নারী আরও বলেন, ‘প্রথমেই একটি ভালো লাগা তৈরি হয়। আস্তে আস্তে শ্রদ্ধেয় রাজীব স্যার ও নাসিমা আক্তার নিশা ম্যামের দিক-নির্দেশনা গুলো ফলো করতে শুরু করলাম। নিজের প্রতি একটা বিশ্বাস তৈরি হলো। আমার স্বামীর সহযোগিতায় আত্মবিশ্বাসের সাথেই রাজশাহী অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী যবের ছাতু নিয়েই দৃঢ়ভাবে কাজ শুরু করি। কিন্তু ভাবিনি এই ছাতু নিয়েই আমি লাখপতি হতে পারব। বর্তমানের উই থেকে আমার সেল প্রায় এক লক্ষ পাঁচ হাজার টাকারও উপরে।’

আরো অনেক অর্ডার হাতে আছে বলে উল্লেখ করে নিপা সেনগুপ্ত উই গ্রুপের সকল সদস্যকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, সকল নারীদের নিজের একটি পরিচয় সব সময় প্রয়োজন এই ক্ষেত্রে উই গ্রুপের সবাই সবাইকে সহযোগিতা করছে।

নিপা সেনগুপ্তের কাজের সাথে এ অঞ্চলের দুইজন প্রান্তিক নারী যুক্ত হয়ে নিজে আয়ের মাধ্যমে পরিবারকে সহযোগিতা করতে পারছেন। তেমন এক নারী রাজশাহীর তানোর উপজেলার দুবইল গ্রামের আবেদা বেগম (৪৮) বলেন, নিপা সেনগুপ্ত বাজার থেকে যব কিনে আমাদের কাছে দেয় আমরাও যবগুলো পরিষ্কার করে শুকিয়ে বালুতে ভেজে দিই। এর জন্য আমরা নিয়মিত টাকাও পাই। যা দিয়ে আমাদের সংসারের অনেক উপকার হয়। আমরা বাড়তি আয় করতে পারি। উই গ্রুপ থেকে নারীদের একটি পরিচয় তৈরি হচ্ছে যা আমাদের সমাজকে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করবে বলেও উল্লেখ করেন গ্রামের এই নারী।

সফল নারী উদ্যোক্তা নিপা সেনগুপ্তের কাছে ব্যবসা নিয়ে তার ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) ও বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এর সাথে যুক্ত থেকে সংগঠনিক সদস্য পদ অর্জন করা ও তাদের সহযোগিতার মাধ্যমে ব্যবসাকে আরো প্রসারিত করতে চাই। একই সাথে গ্রামীন নারীদেরকে এ কার্যক্রমের সাথে আরও সম্পৃক্ত করে তাদের দুঃখ-দূর্দশা দূর করার মাধ্যমে তাদেরকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করার কথাও উল্লেখ করেন।

কোন মন্তব্য নেই