× প্রচ্ছদ পাবনা-৪ উপনির্বাচন ঈশ্বরদী পাবনা জাতীয় রাজনীতি আন্তর্জাতিক শিক্ষাজ্ঞন বিনোদন খেলাধূলা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নির্বাচন কলাম ছবি ভিডিও রূপপুর এনপিপি
Smiley face করোনা ঈশ্বরদী পাবনা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা প্রযুক্তি বিনোদন শিক্ষা



vvv২৮৫৮২২১৮৫৫৩১

বাংলাদেশের বিজয় ও বঙ্গবন্ধু


         
      গোপাল অধিকারী
১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সর্বোচ্চ অর্জনের ও আত্মগৌরবের একটি দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি বিজয় ছিনিয়ে আনে।
দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ স্বাধীন হলেও এই ভুখন্ডের বাঙালির স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আসেনি। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্তে¦র ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হয় এবং পূর্ব বাংলাকে নিয়ে পাকিস্থান নামে একটি অসম রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। তখন থেকেই পাকিস্থানের শাসক গোষ্ঠী বাঙালির ওপর চেপে বসে এবং শাসন, শোষণ ও নির্যাতনের স্টিম রোলার চালায়। শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুভুতিকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র গঠন হলেও হয়নি ভাগ্যের উন্নয়ন। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিকে মুক্তির আকাঙ্খায় উজ্জীবিত করে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের পথে এগিয়ে নিয়ে যান।
১৯৫২ সাল। ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন ‘পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু’। এর প্রতিবাদে বন্দি থাকা অবস্থায় ২১ ফেব্রæয়ারিকে রাজবন্দি মুক্তি এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি দিবস হিসেবে পালন করার জন্য বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতি আহ্বান জানান। ১৪ ফেব্রæয়ারি বঙ্গবন্ধু এ দাবিতে জেলখানায় অনশন শুরু করেন। ২১ ফেব্রæয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্র সমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করে। মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, বরকত, রফিক, শফিউর শহীদ হন। বঙ্গবন্ধু জেলখানা থেকে এক বিবৃতিতে ছাত্র মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। একটানা ১৭ দিন অনশন অব্যাহত রাখেন। জেলখানা থেকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার দায়ে তাকে ঢাকা জেলখানা থেকে ফরিদপুর জেলে সরিয়ে নেওয়া হয়। ২৬ ফেব্রæয়ারি ফরিদপুর জেল থেকে তিনি মুক্তিলাভ করেন। ১৯৫৪ সালে  ১০ মার্চ প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জের আসনে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা ওয়াহিদুজ্জামানকে ১৩ হাজার ভোটে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। ১৫ মে বঙ্গবন্ধু প্রাদেশিক সরকারের কৃষি ও বন মন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। ৩০ মে কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা বাতিল করে দেয়। ৩০ মে বঙ্গবন্ধু করাচী থেকে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং গ্রেফতার হন। ২৩ ডিসেম্বর তিনি মুক্তি লাভ করেন। ২১ অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ প্রত্যাহার করা হয় এবং বঙ্গবন্ধু পুনরায় দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রæয়ারি লাহোরে বিরোধী দলসমূহের জাতীয় সম্মেলনের বিষয নির্বাচনী কমিটিতে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি পেশ করেন। প্রস্তাবিত ৬ দফা ছিল বাঙালি জাতির মুক্তি সনদ। ১ মার্চ বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু ৬ দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সারা বাংলায় গণসংযোগ সফর শুরু করেন। এ সময় তাকে সিলেটে, ময়মনসিংহ ও ঢাকায় বার বার গ্রেফতার করা হয়। বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে বছরের প্রথম তিন মাসে আট বার গ্রেফতার হন।
১৯৭০ সালের ৬ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পুনরায় আওয়ামী লীগ সভাপতি নির্বাচিত হন। ১ এপ্রিল আওয়ামী লীগ কার্যকরী পরিষদের সভায় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ৭ জুন রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু ৬ দফার প্রসঙ্গ আওয়ামীলীগকে নির্বাচিত করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। ৭ ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
৭ মার্চ রেসকোর্সের জনসমুদ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা’। ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে শৃঙ্খল মুক্তির আহ্বান জানিয়ে ঘোষণা করেন, “রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ্। প্রত্যেকে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে মোকাবেলা করতে হবে।” শত্রুর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নেবার আহ্বান জানান।  তার এই ভাষণ বিশ্বের ইতিহাসে আজ বরনীয়। বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়া খানের সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। মূলত ৭ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে বঙ্গবন্ধুই রাষ্ট্রপরিচালনা করেছেন।  ২৫ মার্চ আলোচনা ব্যর্থ হবার পর সন্ধ্যায় ইয়াহিয়ার ঢাকা ত্যাগ। ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্থান সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু ২৫শে মার্চ রাত ১২টা ২০ মিনিটে গ্রেফতারের পূর্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘সম্ভবতঃ এটাই আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনসাধারণকে আহ্বান জানাচ্ছি তোমরা যে যেখানেই আছ এবং যাই তোমাদের হাতে আছে তার দ্বারাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দখলদার সৈন্যবাহিনীকে প্রতিরোধ করতে হবে। যতক্ষণ না পাকিস্থান দখলদার বাহিনীর শেষ ব্যক্তি বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হবে, তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। সেদিনের সেই ভাষন সকল বাঙালীকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরতে ও বিজয়ী হওয়ার প্রেরণা যুগিয়েছিল। এখনও শিহোরণ জেগে ওঠে তার সেই ভাষণের বাণী শুনলে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্থানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম করলেও বিজয়ের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের স্বাক্ষী হতে পারেন নাই। তিনি দেশে ফেরেন ১০ জানুয়ারী। তাই সেই দিনকে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস হিসেবে পালন করে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ। তাকে কারাবন্দী করে রাখা হয়েছে। ১৯৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি ঢাকায় পৌঁছলে তাকে অবিস্মরণীয় সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। সেই বছরই ১০ অক্টোবর বিশ্ব শান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরী’ পুরস্কারে ভূষিত করে। ১৯২০ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৪ আগ্েট পূর্ব পর্যন্ত পুরো অধ্যায়টাই ছিল শিক্ষনীয়, অনুকরণীয় ও সমুজ্জ্বল। তাঁর মত এমন ত্যাগ আর কোন নেতার করতে হয় নি। সহজেই অনুমান করা যায় ওই পাক হানাদারদের লক্ষ্যই ছিল শেখ মুজিব। কারণ শেখ মুজিবকে কিনতে পারলেই পরাজিত হত বাংলাদেশ।
শেখ মুজিবুর রহমান। লক্ষ্য বিজয়ী একটি নাম। একটি প্রতীক। একটি স্বাধীনতা, একটি বিজয়, একটি সফলতার গল্পের নায়ক। তাই বঙ্গবন্ধু কোন ব্যক্তিমাত্র নন, অবিনশ্বর এক আদর্শ ও প্রেরণার নাম। সেই প্রেরণাতেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ এই চিন্তা অস্বাভাবিক কিছু নয়। শেখ মুজিবুর রহমানের মানবমুক্তির দর্শনে বলীয়ান হয়ে প্রাণের স্বদেশ গড়বে এটাই স্বাভাবিক। জগতে এভাবেই একজন ব্যক্তির সঠিক দিকনির্দেশনায় আলো দেখে ভবিষ্যত প্রজন্ম। শেখ মুজিবকে দেশপ্রেমের জন্যই বঙ্গবন্ধু উপাধী দেওয়া হয়েছে। তাই বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশের প্রতীক নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে অস্বীকার করার উপায় নেই।  বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রতীক হয়ে থাকবে এসত্যকে মেনে না নিলে ইতিহাস কখনও মেনে নিবে না, ইতিহাস কখনও ক্ষমা করবে না।  
“বাংলাদেশ”! পৃথিবীর মানচিত্রে লাল-সবুজে আঁকানো একটি দেশের নাম। আর ‘বাংলাদেশ’ আমার কাছে অশ্রæসিক্ত মায়ের অক্ষিকোঠরে জমে থাকা ভালবাসার নাম। ‘বাংলাদেশ’ আমার কাছে গর্বের নাম। বাংলাদেশ আমার কাছে স্বাধীনভাবে চলা একটি মাতৃভূমির নাম। আর বঙ্গবন্ধু এই বাংর্লা একটি বিশ্বাসের নাম। একটি ভরসার আশ্রয়স্থল। তাইতো কবিতার চরণে বলতে ইচ্ছে হয়, যতদিন রবে পদ্মা, যমুনা, গৌরি, মেঘনা  বহমান, ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
gopalodikari1213@gmail.com
০১৭২৩-০৯১২১৩
      


কোন মন্তব্য নেই