× প্রচ্ছদ পাবনা-৪ উপনির্বাচন ঈশ্বরদী পাবনা জাতীয় রাজনীতি আন্তর্জাতিক শিক্ষাজ্ঞন বিনোদন খেলাধূলা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নির্বাচন কলাম ছবি ভিডিও রূপপুর এনপিপি
Smiley face করোনা ঈশ্বরদী পাবনা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা প্রযুক্তি বিনোদন শিক্ষা



১৬ মার্চ ১৯৭১: বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়ার দেড়শ মিনিটের বৈঠক

বঙ্গবন্ধু- ইয়াহিয়ার দেড়শ মিনিটের বৈঠক 

ইতিহাস টুয়েন্টিফোর প্রতিবেদকঃ

অগ্নিঝরা মার্চের ১৬ তারিখ। ১৯৭১ এর মার্চের দিনগুলো ছিল  উত্তাল। বাঙালির মনে মুক্তির স্বাদ গাঢ় হচ্ছে। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তান বাঙালিদের নিজেদের কব্জায় নেয়ার পায়তারায় ব্যস্ত। ১৫ মার্চ ইয়াহিয়া গোপনে ঢাকা সফরে আসেন। ছিল না কোনো সাংবাদিক, কোনো উচ্চপদস্থ কেউ। গোপনে এয়ারপোর্টে পৌঁছান ইয়াহিয়া। এদিকে সারাদেশে নবম দিনের মতো সারাদেশে অসহযোগ আন্দোলন চলছে। 

সুপ্ত উত্তাল আগুনে ফুঁসছিল গোটা বাংলা। মুক্তিপাগল বাঙালি শুধু বঙ্গবন্ধুর মুখে চূড়ান্ত ডাকের অপেক্ষায়। ১৬ মার্চ, সকাল পৌনে ১১টা। ধানমণ্ডির বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধুর গাড়ি বের হল। শোক আর প্রতিবাদের প্রতীক কালো পতাকা উড়ছে, বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত মাজদা গাড়ির ফ্ল্যাগস্ট্যান্ডে, আর উইন্ড স্ক্রিনে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত পতাকা। বাঙালী হত্যার প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে গাড়িতে কালো পতাকা উড়িয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বঙ্গবন্ধু।সারাদেশে চলছে অসহযোগ আন্দোলন

এভাবে পাক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করতে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে, গত কয়েকদিনে এ দেশে পাক সেনারা যা ঘটিয়েছে তার প্রতিবাদ এবং আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান না এলে চূড়ান্তভাবে গাঢ় সবুজের পটভূমিতে লাল সূর্যের বুকে বাংলাদেশের ম্যাপ আঁকা পতাকা উড়বে।


সকাল থেকেই উৎসুক জনতা অপেক্ষা করছিল বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়া খানের বৈঠকের ফল কি হয় তা জানতে। এক হাতে কালো পাইপ, অন্য হাতটি নাড়ছেন জনতার উদ্দেশ্যে। সঙ্কট নিরসনের আন্তরিক আশা নিয়ে তিনি যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট হাউসে ইয়াহিয়ার সঙ্গে বৈঠক করতে। সকাল ১০টায় শুরু হওয়া বৈঠকটি শেষ হয় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে।

১৫ মার্চ গোপনে ঢাকা সফরে আসেন ইয়াহিয়া

বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের জানান, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আরও আলোচনা হবে। তবে ইয়াহিয়ার পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।পাক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বৈঠক সম্পর্কে সংবাদপত্রে প্রধান প্রধান শিরোনামে লেখা হয় “সাড়ে সাত কোটি মুক্তিকামী বাঙালির অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় নীতি ও শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কে দেড়শ’ মিনিট কাল স্থায়ী এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হন। একজন চাইছেন আলোচনার মাধ্যমে সমাধান, অন্যজনের মনে গণহত্যার ছক। একজনের মনে স্বাধীনতার মন্ত্র, অন্যজনের মনে নির্মূল করার বাসনা। একজন কামনা করছেন আর রক্তপাত নয়, আরেকজন দেখতে চান রক্তের হোলি খেলা। এই যেখানে আলোচনার প্রেক্ষাপট, সেখানে বৈঠক কতটা ফলপ্রসূ হতে পারে!


ইতিহাসের দিকে তাকালেই এ সত্যতা পাওয়া যায়। এদিন শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের আলোচনার পাশাপাশি সারাদেশে আন্দোলন বাঁধভাঙ্গা রূপ নিয়েছে। রাজপথ মিছিলে মিছিলে উত্তপ্ত করে রাজনৈতিক নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষজনও দেশের উদ্ভূত সমস্যার চূড়ান্ত সমাধানে বঙ্গবন্ধুর সর্বশেষ মন্তব্যের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। এরই মধ্যে ৩ মার্চ থেকে শুরু হওয়া অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়ে। মাঠে ময়দানে সর্বত্রই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষণা নিয়ে তোলপাড়।


একাত্তরের এদিনে বঙ্গবন্ধুর নতুন নির্দেশ এলো, এখন থেকে ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক কেন্দ্রের শুল্ক, কর, আবগারি কর ও বিক্রয় কর গ্রহণ করবে। তবে এসব কর স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানে জমা দেয়া হবে না। এভাবেই অসহযোগ আন্দোলন তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়। এ সময় মওলানা ভাসানী ময়মনসিংহের জনসভায় দাবি করেন, বাংলাদেশের পাওনা বাংলাদেশকে বুঝিয়ে দিন।


চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে বুদ্ধিজীবীদের সভায় আবুল ফজল, সৈয়দ আলী আহসান, ড. আনিসুজ্জামান প্রমুখ অসহযোগ আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করেন। বসে নেই পাক হানাদাররা। সাতক্ষীরায় মিছিলে গুলি চালিয়ে মানুষ মারা হলো, দেশের মানুষকে অনাহারে মারার চক্রান্ত করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা চার জাহাজ বোঝাই গম চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস না করে করাচী পাঠিয়ে দেয়া হয়। এগুলো এসেছিল ত্রাণ হিসেবে। এদিকে দেশের সর্বত্র উড়ছে কালো পতাকা।


পত্রিকায় প্রকাশিত সেদিনের সংবাদ

মহল্লায় মহল্লায় গড়ে উঠতে থাকে সংগ্রাম কমিটি। সব বয়স সব পেশা ও শ্রেণীর মানুষ বেরিয়ে আসতে থাকে রাজপথে। স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত বঙ্গবন্ধুকে আরও উজ্জীবিত করতে রাস্তায়, মাঠে ময়দানে তখন গণসঙ্গীত, নাটক, পথনাটক ও পথসভা করে চলছে উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, বেতার টেলিভিশন শিল্পী সংসদ, মহিলা পরিষদ প্রভৃতি সংগঠন। হাইকোর্টের আইনজীবী, বেসামরিক কর্মকর্তা কর্মচারীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করতে থাকে।

নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন বঙ্গবন্ধু

আর মুক্তিকামী বাঙালি ফুঁসে উঠতে থাকে। স্বাধীনতা তাদের চাই-ই-চাই। অগ্নিঝরা মার্চের একেকটি দিন যাচ্ছে আর পালটে যাচ্ছে পূর্ব বাংলার দৃশ্যপট। হানাদারদের অমানবিক নির্যাতনের বলি আর হবে না বাঙালি। ঘনিয়ে আসতে থাকে স্বাধীনতার নতুন সকাল হওয়ার সময়। এদিকে আপামর বাঙালি প্রস্তুতি নিচ্ছে নিজেদের সাধ্য মতো। একটা উচিত শিক্ষা দিতে চায় তারা ইয়াহিয়া আর তার বাহিনীকে। শুধু সময়ের অপেক্ষা।  

কোন মন্তব্য নেই