× প্রচ্ছদ পাবনা-৪ উপনির্বাচন ঈশ্বরদী পাবনা জাতীয় রাজনীতি আন্তর্জাতিক শিক্ষাজ্ঞন বিনোদন খেলাধূলা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নির্বাচন কলাম ছবি ভিডিও রূপপুর এনপিপি
Smiley face করোনা ঈশ্বরদী পাবনা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা প্রযুক্তি বিনোদন শিক্ষা



ঈশ্বরদীর সব সিনেমা হল বন্ধ, পাবনা জেলার মধ্যে শুধুমাত্র চলছে রূপকথা্



ইতিহাস টুয়েন্টিফোর প্রতিবেদকঃ 

একসময় দর্শকের করতালিতে মুখরিত সিনেমা হলে আজ সুনসান নীরবতা। সেসব এখন শুধুই স্মৃতি। পাবনার প্রথম গড়ে ওঠা ‘বাণী হল’ আর নব্বই দশকে একই স্থানে নির্মিত ‘বীণা হল’ ১২-১৩শ দর্শকে ভরপুর থাকত। তবে প্রতিষ্ঠার ৭২ বছর পর ২০১৮ সালে বাণী ও নব্বই দশকে স্থাপিত বীণা লোকসানের কারণেই বন্ধ হয়ে যায়।

কথাগুলো বলছিলেন বাণী-বীণা সিনেমা হলের মালিক মো. আনিস। শুধু ঐতিহ্যবাহী বাণী-বীণা নয়, ব্যবসায়িক মন্দার কারণে পাবনায় ২৬ সিনেমা হলের ২৫টিই বন্ধ হয়ে গেছে।

পাবনা শহরে শুধু ‘রূপকথা’ সিনেমা হলটি চালু রয়েছে কোনোমতে। ঈশ্বরদী, ভাঙ্গুড়া এবং চাটমোহরে বিশেষ কোনো উৎসব উপলক্ষে দু-একটি সিনেমা হল চালু করা হয়। লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে সিনেমা হল বন্ধ করে ভবন বিক্রি বা অন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা।

পাবনার সদর উপজেলায় সিনেমা হল ছিল পাঁচটি।বাণী, বীণা, রূপকথা, অনন্ত ও আনন্দ। জেলার সবচেয়ে পুরনো সিনেমা হল আব্দুল হামিদ সড়কে ’অরোরা টকি’ যা পরে ‘বাণী’ নামে পরিচিত হয়। বাণী সিনেমার পশ্চিমে গাঁ ঘেঁষে একই মালিক গড়ে তোলেন বীণা হল।

এ দুই সিনেমা হলের মালিক ও পাবনার গোপালপুর লাহিড়ীপাড়া মহল্লার স্থায়ী বাসিন্দা মো. আনিস জানান, হল ব্যবসা তার দাদা (মৃত) মো. ই্উসুফ শুরু করেন ১৯৪৮ সালে। দাদার পরে বাবা (মৃত) মো. ইউনুস ব্যবসার হাল ধরেন। মো. ইউনুস ১৯৯০ সালে বাণী হল ঘেঁষে ‘বীণা’ সিনেমা হলটি গড়ে তোলেন। ৫৬ বছরের আনিস কলেজে পড়া অবস্থায় ১৯৮৬ সালের দিকে বাবার সঙ্গে হলের ব্যবসা দেখভাল শুরু করেন।

দাদার আমলের ব্যবসার সুবাদে শৈশব-কৈশর-যৌবনে হলের রমরমা ব্যবসা দেখেছেন মো. আনিস। সেই সময়ের সুখকর স্মৃতি আজও তার মনে দোলা দেয়। জানান, দর্শকের উপচেপড়া ভিড়, টিকিট কাটতে ধাক্কাধাক্কি, শব্দ-সঙ্গীত আর করতালিতে মুখর থাকত হল। জায়গার সংকুলান না হওয়ায় অনেক সময়ই নিজেদের বসার জায়গায় দর্শকদের নিয়ে আসা হতো।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি জানান, আমার যৌবনকাল থেকেই সিনেমা ব্যবসায় ধস নামে। হলকেন্দ্রিক প্রায় দেড়-দুশ লোকের কর্মসংস্থান ছিল। আশপাশের দোকান বা ভ্রাম্যমাণ কতজন যে হলনির্ভর দোকান করেছিলেন তার ইয়ত্তা নেই। প্রতিষ্ঠার ৭২ বছর পরে ক্রমাগত লোকসান দিতে দিতে নিরুপায় হয়ে পড়েন। শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন, মাসের পর মাস বিদ্যুৎ বিল মিলিয়ে লোকসান বেড়েই চলছিল। তাই বাধ্য হয়ে দুটি হলই ২০১৮ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বন্ধ করে বাধ্য হই।

হল দুটি ভেঙে বিশাল জায়গা জুড়ে এখন ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এখানে বহুতল বিশিষ্ট মার্কেট ও অ্যাপার্টমেন্ট হবে বলে তিনি জানান।

এদিকে মোবারক হোসেন রত্ন প্রতিষ্ঠিত পাবনার এক সময়ের সাড়া জাগানো অনন্ত সিনেমা হল এখন গোডাউন হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। একই মালিকের রূপকথা হল টিকে আছে কোনোরকমে। আনন্দ হল বন্ধ হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগেই।

জানা গেছে, ঈশ্বরদীতে ছয়টি সিনেমা হলের মধ্যে একটিও চালু নেই। রাজু সিনেমা হলটি উৎসবে চালু থাকে। স্বপ্না, রাজমনি, প্লাজা, ঝলক ও সেতু হল বন্ধ রয়েছে ১০-১২ বছর ধরে।

ভাঙ্গুড়ার তিনটি সিনেমা হলের মধ্যে তিন বছর আগেও চালু ছিল মৌচাক। এখন বিশেষ কোনো উপলক্ষে কয়েকদিন চালু থাকে। আর পাইলট ও রংধনু হল বন্ধ রয়েছে ২০-২২ বছর।

চাটমোহরে তিনটির মধ্যে কোনোরকমে চলছিল লাভলী হলটি। সেটিও এখন বন্ধ। আর প্রেরণা ও অর্পণ হল দুটি বন্ধ ১৪-১৬ বছর ধরে।

এছাড়া বেড়া উপজেলায় ইছামতি ও মন্দিরা হল দুটি বন্ধ আট থেকে ১০ বছর ধরে।

ফরিদপুর উপজেলার দুটি সিনেমা হলের মধ্যে মধুমিতা কোনোমতে চালু ছিল। এখন সেটিও বন্ধ হয়েছে। এক যুগ ধরে বন্ধ বলাকা সিনেমা হলটি। আটঘরিয়ার একমাত্র উপহার সিনেমা হলটি ১৫ বছর ধরে বন্ধ।

সুজানগরের নন্দিতা হল ১০ বছর এবং সাঁথিয়ার তিনটি হল শাপলা, সাথী ও সোহাগ বন্ধ ১৫-২০ বছর ধরে। কাশীনাথপুরে যে সিনেমা হলটি ছিল সেখানে এখন তার কোনো নিশানা খুঁজে পাওয়া যায়নি। এখন সেখানে বিপণিবিতান গড়ে উঠেছে। পাবনার অন্যতম বিপণি কেন্দ্র আতাইকুলায় একটি মাত্র সিনেমা হল বন্ধ ও বিক্রি হয়ে গেছে। এখন সেখানে গড়ে উঠেছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

কবি ও গীতিকার আলাউল হোসেন নামের এক দর্শক বলেন, ‘একসময় পরিবার নিয়ে হলে ছবি দেখতাম। এখন হলে যাওয়া হয় না। হলের পরিবেশও আগের মতো নেই। এছাড়া এখনকার সিনেমার কাহিনী দর্শক টানতে পারে না।’

মাহাতাব বিশ্বাস রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার রনজিত কুমার প্রামাণিক বলেন, ‘যৌবনকালে অনেক সিনেমা দেখেছি। ১৯৭৩ সাল থেকে শুরু করি সিনেমা দেখা। তখন সিনেমা দেখার অনেক মজা ছিল। জীবনঘনিষ্ঠ সেসব ছবি ছিল শিক্ষণীয়। একসময় সিনেমা শিল্প তার ঐতিহ্য বিসর্জন দিতে শুরু করল। হলের পরিবেশ খারাপ হতে থাকল। ফলে হলে সিনেমা দেখা বাদ দিলাম। এখন সিনেমা চলে কি চলে না, হল বন্ধ কি খোলা শহরে বসেও সে খবরও জানি না।’

পাবনা শহরের বাসিন্দা ও পেশায় সার্ভেয়ার পদে চাকরি করা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আগে ছবি দেখতাম। গত ১৫-১৬ বছর সিনেমা হলেই যাওয়া হয় না।’

তিনি বলেন, ‘ডিস লাইনের কল্যাণে এখন বাড়িতে বসেই সিনেমা দেখা যায়। সিনেমা হলে যাওয়ার দরকারই হয় না।’

পাবনার উৎসবমুখর অন্যতম হল ছিল অনন্ত। এখন আর সেটিতে সিনেমা প্রদর্শন করা হয় না। এটি এখন গোডাউন হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।

পাবনা শহরে ‘রূপকথা’ নামের যে একটি মাত্র হল চালু রয়েছে সেটার অবস্থাও মরমর। এসব হলে বিভিন্ন সময় নতুন-পুরনো ছবি চললেও তা দর্শক টানতে পারছে না। গত বুধবার (২৪ মার্চ) এ হলে সিনেমা দর্শকদের বক্তব্য জানার জন্য তিন ঘণ্টা অপেক্ষা শেষে মাত্র ২-৩ জন দর্শকের দেখা পান এ প্রতিবেদক। সিনেমা হলে ম্যানেজার, অপারেটর, সিকিউরিটি সবই আছে। নেই শুধু দর্শক।

শহরে বন্ধ হওয়া সিনেমা হল অনন্ত এবং চালু থাকা একমাত্র হল রূপকথা সিনেমা হলের মালিক কবি সোহানী হোসেন বলেন, ক্যাবল টিভিতে এখন অসংখ্য স্যাটেলাইট চ্যানেলের সুবিধা। প্রতিদিনই দেখানো হয় দীর্ঘ ধারাবাহিক। এসব ধারাবাহিক বিনোদনের অন্যতম উৎস হিসেবে পরিণত হয়েছে। ফলে মানুষ এখন আর হলে এসে সিনেমা দেখতে চান না। তারপরও দর্শকদের রুচি ও সুবিধার কথা চিন্তা করে হল আধুনিকায়ন করে তার বিশেষায়িত সিনেমা হল রূপকথা এখনও চালু রেখেছেন। ভালোমানের গল্প ও মনের মতো অভিনয় পেলে দর্শক আবার হলমুখী হবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।


কোন মন্তব্য নেই