× প্রচ্ছদ পাবনা-৪ উপনির্বাচন ঈশ্বরদী পাবনা জাতীয় রাজনীতি আন্তর্জাতিক শিক্ষাজ্ঞন বিনোদন খেলাধূলা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নির্বাচন কলাম ছবি ভিডিও রূপপুর এনপিপি
Smiley face করোনা ঈশ্বরদী পাবনা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা প্রযুক্তি বিনোদন শিক্ষা



দুই যুবক আর পাবনার এসপির মানবিকতায় নতুন জীবন ফিরে পেল তুষার

দুই যুবক আর এসপির মানবিকতায় নতুন জীবন ফিরে পেল তুষার

ইতিহাস টুয়েন্টিফোর প্রতিবেদকঃ 

১৮ দিন নিখোঁজ থাকার পর ঢাকা থেকে শুক্রবার (৯ এপ্রিল) পাবনায় পরিবারের কাছে নিরাপদে ফিরেছে কিশোর তুষার (১৪)। ১৮ দিনের মধ্যে তার ১৫ দিন কাটে শুধু পাউরুটি আর পানি খেয়ে আবার কোনোদিন না খেয়ে। ঢাকার দুই যুবক এবং পাবনা পুলিশ সুপার মহিবুল ইসলাম খাঁনের মানবিকতায় ঘরে ফিরতে পেরেছে তুষার।

তুষার পাবনা পৌর সদরের অদূরে দ্বীপচর মহল্লার মুকুল মোল্লা ও রীমা বেগমের ছোট ছেলে। তুষার ২৩ মার্চ বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়। করোনা সংক্রমণ ও লকডাউনের মধ্যে তার ভাগ্যে কী ঘটছিল তা ভেবে বাবা-মাসহ পরিবারের লোকজন ছিলেন দিশেহারা।

তুষারের বাবা মুকুল মোল্লা শনিবার (১০ এপ্রিল) রাতে জানান, তার ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই অন্যরকম। অনেক চেষ্টা করেও তাকে লেখাপড়া করানো যায়নি। তার বড় ছেলে মো. ইসলাম গার্মেন্টসে চাকরি করেন। এছাড়া তার দুটি মেয়ে আছে।

মুকুল মোল্লা জানান, তুষার মঙ্গলবার (২৩ মার্চ) রাতে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়। তারা বিভিন্ন জায়গায় সাধ্যমতো খোঁজাখুজি করেন। ঢাকায় তার আরেক ছেলেসহ আত্মীয় স্বজনকেও জানান। কিন্তু কেউ কোনো খোঁজ পাননি। আর করোনার জন্য লকডাউন থাকায় খুব বেশি খোঁজ খবরও নিতে পারেননি কেউ।

এদিকে তুষারের বেঁচে থাকার সংগ্রাম চলে ঢাকা শহরে। ট্রেনে চড়ে ঢাকায় গিয়ে তেজগাঁও স্টেশনে নামে সে। তার হাতে টাকা ছিল না কিনা কেউ জানে না। তবে সে বেশ কয়েকদিন অনাহারে ছিল। আর কয়েকদিন পাউরুটি আর পানি খেয়ে স্টেশনে শুয়ে দিন পার করেছে। এভাবে কয়েক দিন পার হওয়ার পর সে মরণাপন্ন হয়ে যায়।

এ সময় দেবদূতের মতো হাজির হন দুই যুবক। তারা হলেন নরসিংদীর রাজ আনোয়ার হোসেন এবং মাগুরা জেলার বাসিন্দা জহুরুল হক।

রাজ আনোয়ার হোসেন  জানান, তারা দুজনই চাকরিজীবী। বিকেলে স্টেশন এলাকার দিকে প্রায়ই যান গল্প করতে। সেখানে গত মঙ্গলবার (৬ এপ্রিল) জহুরুল হক ছেলেটিকে দেখেন। ক্ষুধায় জর্জরিত মৃতপ্রায় তুষারকে দেখে জহুরুল হক বুঝতে পারেন সে বিপদগ্রস্ত। তিনি তুষারকে জিজ্ঞেস করেন তার বাড়ি কোথায়? সে শুধু বলে দীপচর, পাবনা। গত বেশ কিছুদিন ধরে সে খেতে পারেনি বলেও জানায়। এক কাপড়ে থাকায় সেগুলো নোংরা ও ভেজা ছিল।

তার প্রতি সদয় হয়ে জহুরুল সাত-পাঁচ না ভেবে তাদের মেসে নিয়ে যান। কিন্তু এতে অন্যান্যরা একটু শঙ্কিত ও ভীত হন। কারণ এখন করোনা সংকট চলছে। তবে জহুরুলের রুমমেট রাজ আনোয়ার হোসেনও ছেলেটির প্রতি সদয় হন।

রাজ জানান, তার পরার জন্য শার্ট-প্যান্ট দিই। এরপর ছেলেটিকে তাৎক্ষণিকভাবে আগে গোসল ও খাবারের ব্যবস্থা করি।

এদিকে দুই দিন না যেতেই সরকারি ঘোষণা আসে ১৪ এপ্রিল থেকে সর্বাত্মক লক ডাউন শুরু হবে। এবার লকডাউনে তারা গ্রামের বাড়িতে চলে যাবেন। তুষারকে নিয়ে কী করবেন এনিয়ে তারা দিশেহারা হয়ে যান। সে তার বাড়ির পুরো ঠিকানা বা মোবাইল নম্বর বলতে পারছিল না। কথাও খুব কম বলছিল। এ অবস্থায় রাজ ফেসবুক গ্রুপের আশ্রয় নেন। তিনি পাবনার একটি গ্রুপে অ্যাড হন। এরপর তুষারের বিষয়ে পোস্ট দেন। কিন্তু এতে তেমন কেউ সাড়া দেননি।

পোস্ট দেয়ার একদিন পর পাবনা পুলিশ সুপার (এসপি) মহিবুল ইসলাম খাঁন সেটি দেখেন। তিনি ওই পোস্টের উত্তরে জানান, তিনি তুষারের পরিবারের খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করবেন। পুলিশের এমন উদ্যোগের কথা জেনে আশ্রয়দাতারাও নির্ভার হন।

তখন আনোয়ার হোসেন পুলিশ সুপারের উদ্দেশ্যে লেখেন, ‘আসসালামু আলাইকুম স্যার, ০১৯......৩৭ এটা আমার মোবাইল নম্বর। আমি ঢাকা বসুন্ধরা গ্রুপের বসুন্ধরা সিটিতে জব করি। পাবনার এই ছেলেটি কয়দিন ধরে আমাদের সাথেই আছে। এর আগে সে তেজগাঁও রেল স্টেশনে শুয়ে থাকত। ওখান থেকে আমারা নিয়ে এসেছি। আমাদের সাধ্যমতো হেল্প করেছি। ওকে কিভাবে পাঠানো যায় হেল্প করলে ভালো হত।’

পুলিশ সুপার শুধু এলাকার নামের সূত্র ধরে দ্রুতই তুষারের পরিবারের খোঁজ পান। তুষারের উদ্বিগ্ন পিতা- মাতা পুলিশ সুপারের সহমর্মিতায় আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন।

পাবনা পুলিশ সুপার মহিবুল ইসলাম খাঁন জানান, তিনি তুষারের বাবা-মাকে খুঁজে বের করার দ্রুত উদ্যোগ নেন। একদিনেই তার বাবা মুকুল মোল্লা ও মা রীমা বেগমকে খুঁজে পান। তাদের হারিয়ে যাওয়া সন্তানের খোঁজ পাওয়ার কথা বলতেই আনন্দে উদ্বেলিত হন।

এদিকে ঢাকায় ফেসবুক গ্রুপে পোস্টদাতাকে পুলিশ সুপার তুষারের পরিবারের খোঁজ পাওয়ার কথা জানান। হারিয়ে যাওয়া কিশোর তুষারের বাবা পুলিশ সুপারকে জানান, উজ্জ্বল হোসেন নামে তার এক শ্যালকের জামাই ঢাকায় থাকেন।

উজ্জল হোসেন তখন ঢাকায় তুষারের আশ্রয়দাতা ওই দুই যুবকের কাছে যান। উজ্জ্বল হোসেন গেলেও তিনি যে তুষারের আত্মীয় সেটি নিশ্চিত হতে চান আশ্রয়দাতারা। তুষারের পরিবারের মাধ্যমে আশ্রয়দাতা ওই দুই যুবককে উজ্জ্বলের পরিচয় নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করেন এসপি মহিবুল ইসলাম খাঁন।

রাজ আনোয়ার হোসেন জানান, তারা পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তুষারকে তার দুলাভাই উজ্জ্বলের হাতে তুলে দেন। উজ্জ্বল একটি গাড়ি রিজার্ভ করে শুক্রবার রাতে তুষারকে তার বাবা-মায়ের কাছে তুলে তেন।

আনোয়ার হোসেন  জানান, এসপি মহিবুল স্যার, যার ব্যাপারে বললে কম হয়ে যাবে। তার কাছে চিরকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এমন পুলিশ অফিসার যেন প্রতিটি জেলায় জেলায় অন্তত একজন করে থাকেন, সেই দোয়াই করি। তার এক্টিভিটি দেখে যে কেউ অবাক হবেন। মানবিকতার দিক দিয়ে তিনি সর্বোচ্চ উদার মনের অধিকারি। এমন একজন মানুষের রেসপন্স পেয়ে সত্যিই খুব ভালো লাগছে। অবশেষে তুষারকে ফিরিয়ে দিতে পেরেও খুব ভালো লাগছে।

তুষারের বাবা মুকুল মোল্লা  জানান, এসপি স্যারের সহায়তা না পেলে তুষারের কী হত জানি না। তিনি ঢাকার আশ্রয়দাতা দুই যুবকের প্রতিও গভীর কৃতজ্ঞতা জানান।

তুষারের মা রীমা বেগম জানান, আমার হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে যারা রাস্তা থেকে আধমরা অবস্থায় তুলে নিয়ে আশ্রয় দিয়েছেন তাদের প্রতি আমার আজীবনের কৃতজ্ঞতা। আর পাবানার পুলিশ সুপার স্যার আমাদের জন্য নিজের আপনজনের মতো করেছেন। তার সহযোগিতার কথাও মনে থাকবে। সবার জন্য দোয়া করি।

পাবনা পুলিশ সুপার জানান, নিজ দায়িত্ববোধ থেকে, মনের তাগিদ থেকেই তিনি সম্ভাব্য সহযোগিতা করেছেন। পাবনায় যতদিন আছেন পাবনার মানুষের জন্য তিনি চেষ্টা করবেন ভালো কিছু করার। মানুষের জন্য নির্মোহভাবে কিছু করতে পারাইতো জীবনের সার্থকতা বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

(তথ্য সূত্র জাগো নিউজ)। 

কোন মন্তব্য নেই