ঢাকাশনিবার , ৬ নভেম্বর ২০২১

বসুন্ধরার এমডিকে একাধিকবার হত্যাচেষ্টা, পটিয়ার যুবক আটক

বিশেষ প্রতিবেদক
নভেম্বর ৬, ২০২১ ২:০৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র লিমিটেডের চেয়ারম্যান সায়েম সোবহান আনভীরকে একাধিকবার হত্যাচেষ্টা হয়েছে। সর্বশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী জুমার নামাজের সময় আনভীরকে গুলি করে হত্যার ষড়যন্ত্র হয়। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে সাইফুল ইসলাম সাদ (২৩) নামে চট্টগ্রামের পটিয়ার এক যুবককে আটক করেছে রাজধানীর ভাটারা থানা পুলিশ। শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সাউতুল কোরআন মাদরাসা ও এতিমখানা থেকে তাকে আটক করা হয়। অভিযোগটি তদন্ত করছেন ভাটারা থানার এসআই ও তদন্ত কর্মকর্তা হাসান মাসুদ। তিনি আদালতে অভিযুক্ত সাদের পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সাদ জানিয়েছেন, শুক্রবার (৫ নভেম্বর) পবিত্র জুমার নামাজ চলাকালে সায়েম সোবহান আনভীরকে গুলি করে হত্যার প্রস্তুতি ছিল তার। পটিয়ার সংসদ সদস্য হুইপ সামশুল হক চৌধুরী এবং তার ছেলে নাজমুল করিম ওরফে শারুন চৌধুরীর নির্দেশে হত্যার এ পরিকল্পনার কথা স্বীকার করেন তিনি। এর আগে দুধের মধ্যে বিষ মিশিয়ে এবং ছুরিকাঘাতে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল সংঘবদ্ধ চক্রটি। তবে একাধিকবার চেষ্টা করেও সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয় তারা।

জিজ্ঞাসাবাদে সাদ আরও বলেছেন, ‘শারুন বলেছে জুমার নামাজের সময় সায়েম সোবহান আনভীরকে সরাসরি গুলি করে দিতে। বাইরে তাদের গাড়ি অপেক্ষা করবে। মসজিদ থেকে দ্রুত পালিয়ে আমি যাতে ওই গাড়িতে উঠে যেতে পারি- সে ধরনের ব্যবস্থার কথাও জানায়।’
ভাটারা থানা-সূত্র জানায়, বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীরকে হত্যার পরিকল্পনার খবর পেয়ে সন্দেহভাজন হিসেবে সাইফুল ইসলাম সাদকে আটক করা হয়। শুক্রবার তাকে আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। সাদকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে এ হত্যা মিশনের মূল হোতাদের বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় তিন মাস ধরে বসুন্ধরা এমডিকে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছিল। অন্তত চারবার ছদ্মবেশে বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি হাউসে ঢোকেন সাদ। হুইপ সামশুল হক ও তার ছেলে শারুনের নির্দেশনায় কীভাবে আনভীরকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল তার বিস্তারিত জানান সাদ। কয়েকবার ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত মাদরাসা শিক্ষার্থীর ছদ্মবেশ ধরেন। ভর্তি হন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সাউতুল কোরআন মাদরাসা ও এতিমখানায়। কারণ সে মাদরাসা থেকে প্রতিদিন বসুন্ধরা এমডির বাসায় কোরআন খতমের জন্য শিক্ষার্থীরা আসেন। সেই দলের সঙ্গে মিশে জুমার নামাজ পড়ার সময় বসুন্ধরা এমডিকে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের শেষ চেষ্টা করেন।

মাদরাসার অধ্যক্ষ মুফতি মিসবাহ উদ্দিন সগির জানান, কিছুদিন ধরে সাদের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হচ্ছিল। সে ফোনে কথা বলার সময় ঘুরেফিরে তার মুখে হুইপ এবং শারুনের নামটি শোনা যেত। এরপর সাদের গতিবিধি কড়া নজরদারিতে রাখছিলেন অধ্যক্ষ। হুইপ ও শারুন চৌধুরীর পরিকল্পনায় সাদ যে বসুন্ধরার এমডিকে হত্যার মিশন নিয়ে এখানে এসেছিলেন, তা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর তিনি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও কর্মীদের বিষয়টি অবহিত করেন।
এ ঘটনায় শুক্রবার ভাটারা থানায় বসুন্ধরা গ্রুপের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান মেজর (অব.) শেখ মিজানুর রহমানের বাদী হয়ে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছিল। অভিযোগে সাদ ছাড়াও হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে হুইপ সামশুল হক চৌধুরী ও তার ছেলে শারুন চৌধুরীকে আসামি করার আবেদন করা হয়। অভিযোগে বলা হয়- পূর্বশত্রুতার জের ধরে হুইপপুত্র শারুন চৌধুরী বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীরকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। এর আগেও কয়েক দফা এ ধরনের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিল চক্রটি।
মামলার বাদী মিজানুর রহমান জানান, হুইপ সামশুল হক ও তার ছেলে শারুন বসুন্ধরা গ্রুপের এমডিকে হত্যার নীলনকশা করেন। এজন্য তাদের আস্থাভাজন পটিয়ার যুবক সাইফুল ইসলাম সাদকে কৌশলে দিনমজুরের ছদ্মবেশে বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি হাউসে পাঠান। বিভিন্ন কাজের সুবাদে সে এমডি হাউসে চারবার প্রবেশও করেছিল।
তিনি জানান, সাদ নিয়মিত বাড়ির বাইরে গিয়ে খামার থেকে এমডি হাউসে দুধ নিয়ে আসার কাজ করত। পরিকল্পনা মোতাবেক সাদকে ওই দুধের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন শারুন। কিন্তু কয়েক দফা পরিকল্পনায় তা ভেস্তে যায়। এরপর বসুন্ধরার এমডিকে শুক্রবার মসজিদে জুমার নামাজ পড়ার সময় ছুরি মেরে খুন করার প্রস্তুতিও ছিল তাদের। তবে অনুকূল পরিস্থিতি না থাকায় সাদ ওই পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
জিজ্ঞাসাবাদে সাদ জানিয়েছেন, তিনি চট্টগ্রামের পটিয়া সেন্ট্রাল হাইস্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় হুইপ সামশুলের ক্যাডার হান্নান ও মান্নানের সঙ্গে পরিচয় হয়। হান্নান ও মান্নান একপর্যায়ে সাদকে সামশুল এবং শারুনের কাছে নিয়ে যান। সামশুল ও শারুনের নির্দেশনায় এবং প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানেই তিনি পরিচয় গোপন করে বসুন্ধরা এমডির বাসায় কাজ নিয়েছিলেন। এছাড়া হুইপের সঙ্গে সাদের ঘনিষ্ঠ ছবিও পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, দিনমজুরের ছদ্মবেশে বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি হাউসে কাজ নেন সাদ। এমডি হাউসে প্রবেশের সুযোগ হাতের নাগালে চলে আসার খবরটি মুহূর্তেই চলে যায় হুইপ সামশুর ক্যাডার হান্নান ও মান্নানের কানে। এরপর শারুন চৌধুরীর সঙ্গে সাদের বৈঠকের ব্যবস্থা করে দেন তারা। ওই বৈঠকে বসুন্ধরার এমডিকে হত্যার পরিকল্পনার কথা সাদকে জানান শারুন এবং তার বাবা। কাজটি করে দিলে সাদের পুরো জীবনে আর কিছু করা করা লাগবে না বলেও টোপ ফেলেন বাবা-ছেলে। সেই মিটিংয়ে সাদের হাতে নগদ ২০ হাজার টাকা ধরিয়ে দেন শারুন। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে আরও টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়।

মামলার অভিযোগের তথ্যমতে, চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় গত দুর্গাপূজার ছুটিতে সাদ যখন বাড়ি যান। ১০ অক্টোবর ছুটি নিয়ে চট্টগ্রামে যান সাদ। ১২ দিন ছুটি কাটিয়ে ২৩ অক্টোবর কর্মস্থলে ফিরে আসেন। ছুটিতে যাওয়ার পর শারুনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় সাদের। এ সময় সাদকে একটি পিস্তল দিয়ে বসুন্ধরার এমডিকে গুলি করে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়। পরিকল্পনা মোতাবেক ৫ নভেম্বর (শুক্রবার) জুমার নামাজ পড়ার সময় বসুন্ধরার এমডি আনভীরকে গুলি করে হত্যার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সাদ।

সূত্র জানান, বসুন্ধরা গ্রুপের এমডিকে হত্যার পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে সাদকে বড় ধরনের পুরস্কৃত করার আশ্বাস দিয়েছিলেন শারুন চৌধুরী। আর ব্যর্থ হলে তাকেই প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। থানা-পুলিশ ম্যানেজ করারও আশ্বাস দেওয়া হয় তাকে। চট্টগ্রাম থেকে ফিরে গত দুটি জুমার নামাজে সঙ্গে পিস্তল নিয়ে রেখেছিলেন সাদ। কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় সফল হননি।

(সূত্র- বাংলাদেশ প্রতিদিন)।

error: Please Stop!!You can not copy this content becuase this site content is under protection. Thank You Itihas24 Developer Team