যেখানেই থাকি হৃদয়ে বাংলাদেশঃ পর্ব-১ » Itihas24.com
ঈশ্বরদী২৯শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
ঈশ্বরদীর সবশেষ নিউজ । ইতিহাস টুয়েন্টিফোর
আজকের সর্বশেষ সবখবর

যেখানেই থাকি হৃদয়ে বাংলাদেশঃ পর্ব-১

মেজর মোহাম্মদ আহসান হাবিব (অবঃ)
ডিসেম্বর ৭, ২০২৩ ৭:৪০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

লাইবেরিয়ার এয়ারপোর্ট থেকে ক্যাম্পের দিকে যাচ্ছি। ওয়েদার টা বাংলাদেশের বসন্তকালের মতো। সারা বছর প্রায় একইরকম ওয়েদার। দেশটা দেখতেও বাংলাদেশের মতো। কালো মানুষের দেশ কিন্তু কাক সাদা কেন? ???? এয়ারপোর্টের পাশেই স্টেডিয়াম দেখে লাইবেরিয়ার ফুটবল প্লেয়ার জর্জ উইয়াহর কথা মনে পড়ে গেলো। জর্জ উইয়াহ ১৯৯৫ সালে ফিফার বর্ষ সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন এবং Ballon d’Or জিতে নেন।

তিনি এখন পর্যন্ত আফ্রিকার একমাত্র প্লেয়ার যিনি এটা জিতেছেন। তিনি ১৯৮৯, ৯৪ ও ৯৫ সালে আফ্রিকান ফুটবলার অব দ্যা ইয়ার নির্বাচিত হ’ন। ১৯৯৬ সালে তাকে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আফ্রিকান প্লেয়ার হিসেবে ঘোষনা করা হয়। বর্তমানে তিনি লাইবেরিয়ার প্রেসিডেন্ট।

লাইবেরিয়ার রাজধানী মোনরোভিয়া থেকে আমাদের সেক্টর সদরদপ্তর প্রায় ২০০ মাইল দূরে অবস্থিত । গাড়িতে যাচ্ছি। দু’পাশে সবুজের সমারোহ। বেশীরভাগই রাবার বাগান। পৃথিবীর সর্বোচ্চ রাবার উৎপাদনকারী দেশ এটি। মাঝে মাঝে আম গাছ দেখতে পাই। সমস্ত গাছ জুড়ে আম ধরে আছে। সারা বছরেই আম ধরে। লাইবেরিয়ানরা আম খাওয়া জানে না, আসলে কোনো ফল ই তারা খেতো না। আমাদের দেখে দেখে পরে ফল খাওয়া শিখেছে। মাটিতে পরে থাকা ফল কে ডেড্ ফল বলে ওরা। লাসা ফিবারের ভয়েও ওরা মাটিতে পরে থাকা ফল স্পর্শ করে না।

ক্যাম্পে যাচ্ছি আর দেশের কথা ভেবে মনটা উদাস হয়ে পড়ছে। গাড়িতে আমার সংগে অন্য একজন অফিসার যেন আমার মনের ভাষা পড়ে নিলো। ইকবাল বলেন ‘স্যার বাংলাদেশের কথা ভেবে চোখে পানি চলে আসছে। এতো সমস্যা দেশে তবুও যেন আমার দেশ আমার প্রান।’ আমারও চোখ ভিজে গেলো।

মধ্য রাতে ফায়ারের মাধ্যমে ক্যাম্পে আমাদের স্বাগত জানানো হলো। আমার রুমের পাশেই মেশিনগানের অনবরত বার্স্ট ফায়ার। বিদ্রোহীরা জায়গা পরিবর্তন করে ক্যাম্পের অন্য প্রান্তে গিয়ে আবার গুলি করে। সকাল পর্যন্ত এমনি চললো। আমরাও পজিশন নিয়ে রাত কাটিয়ে দিলাম। পরের দিন রেকিতে বের হ’লাম। মাটির রাস্তা দিয়ে কোন এক জংগলে ঢুকে গেছি। হটাৎ করেই দেখি আমার গাড়ির চারিদিক বিদ্রোহীরা ঘিরে রেখেছে। সবার হাতে লোডেড অস্ত্র। ফ্রেন্স ভাষায় কথা বলছে। বুঝলাম এরা পাশের দেশ গিনি অথবা আইভরিকোস্ট থেকে এসেছে। কারন আমেরিকান কলোনি হিসেবে লাইবেরিয়ার স্টেট লেংগুয়েজ ইংরেজি। আমি ভাংগা ভাংগা ফ্রেন্স ভাষায় বুঝালাম ‘ইংরেজিতে কথা বলো’। তখন ওরা অন্য একজনকে ডেকে আনলো। তাকে আমি বুঝাতে পারলাম যে ‘আমরা শান্তিরক্ষী বাহিনী, তোমাদের এন্টি গ্রুপ না।’ তখন সবাই অস্ত্র নামালো। এক পিচ্চি একটা পিস্তল আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে ‘আমাকে ১০ ডলার দাও, আর এই পিস্তলটা নিয়ে নাও।’ আমার প্রশ্নের উত্তরে সে জানায় যে ১০ ডলার দিয়ে সে খাবার কিনবে।

লাইবেরিয়ানদের পেটে খাবার পড়লেই মদ/বার নিয়ে পরে থাকে। বোঝাই যায় পরিকল্পিত ভাবে মদ দিয়ে এদের বুঁদ করে রাখা হয়েছে। মাটির নীচে আছে সোনা লোহা রুপা আর মাটির উপর আছে খনিজ পদার্থের পর পৃথিবীর সবচেয়ে মুল্যবান সম্পদ রাবার বাগান। অথচ দেশে নাই ন্যাশনাল গ্রীড। পুরো দেশে মাত্র দুইটি ন্যাশনাল হাইওয়ে; মনরোভিয়া থেকে ইয়াকাপা আর মনরোভিয়া থেকে ওদের সমুদ্র বন্দর বুকানন। ইয়াকাপা থেকে বুকানন পর্যন্ত রেইল লাইনও আছে।

ইয়াকাপা তে আছে সোনা আর লোহার খনি। ইয়াকাপাতে গিয়ে তো আমি অবাক। এ কোথায় এলাম। মনে হচ্ছে ইউরোপের ছোট্ট সুন্দর একটা শহর। যদিও যুদ্ধের কারনে সাহেবরা এখন আর সেখানে বাস করেন না। কিন্তু তাদের মনোরম বাংলোগুলো বলে দিচ্ছে এখানে ছিলো প্রানের সঞ্চার। শোষনের পার্টটা না হয় নাই বললাম।

কিছুদিন পর আমাকে ফোর্স হেডকোয়ার্টারে বাংলাদেশের লিয়াঁজো অফিসার হিসেবে পাঠানো হলো। নদীর পাড়ে অনেক সুন্দর একটা বাসা পেলাম। সেখানে আমি আর আমার টু-আইসি থাকি। সারাদিন অফিস করি, বিকালে এসে রান্না। বাসার সামনে নদীর উপর গোলঘড় থেকে মাছ ধরতাম। সন্ধ্যায় আটলান্টিক মহাসাগরের পাড়ে বসে থাকতাম। প্রতিদিন মর্নিং ব্রিফিং এ বাংলাদেশের কার্যক্রম তুলে ধরতাম। অন্যান্য দেশ কিংবা ফোর্স হেডকোয়ার্টারের কোন প্রশ্ন থাকলে ক্লিয়ার করতাম।

সেদিন ছিল ২১ ফেব্রুয়ারী -আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আমার সামনে বসে ছিলো পাকিস্তানি দুই অফিসার হামিদ আর ওয়াকাস। আমি জিগ্যেস করলাম তোমরা কি জানো একুশে ফেব্রুয়ারি কিভাবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হলো? আমি জানালাম, বাংলাদেশের বাঙালিদের ভাষার প্রতি ভালোবাসা ও আত্মত্যাগকে সম্মান জানিয়ে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। ১৮৮টি দেশ এই বিষয়টিকে সমর্থন জানালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস গৃহীত হয়।

তারপর বললাম ‘ It is absolutely for you, jerk! In 1952, you mercilessly murdered our innocent people and intended to seize our mother tongue. In 1952, our people devoted their lives to the language movement. You murdered innocent individuals during the liberation war as well.‘ উপস্থিত আমেরিকান, ইথিওপিয়ান আর ইউক্রেনীয় লিঁয়াজো অফিসাররা অবাক হয়ে শুনছিলো আর আমাকে নানা প্রশ্ন করছিলো। আমি আর আমার স্বদেশী অফিসার জামিউল তাদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলাম। পাকিস্তানি অফিসার দু’জন মাথা নিচু করে বসে আছে। নিজেকে আমার ৫২ এর ভাষা সৈনিক বলে মনে হচ্ছিলো তখন।

১২ টায় গোয়েন্দা মিটিং। আমি আমাদের গোয়েন্দা অফিসারের জন্য অপেক্ষা করছি। হটাৎ ফোন এলো বাংলাদেশ সেক্টর থেকে। গোয়েন্দা অফিসার আসতে পারবেন না। আমাকে ব্রিফ করতে হবে। আমি বললাম ‘আমিতো কিছুই জানি না’। বস বললেন ‘তোমাকে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’ কি আর বলবো। আর মাত্র ৩০ মিনিট বাকী আছে মিটিং এর। মেইল চেক করে দেখলাম এখনো ফাইল আসে নাই।

আসলেই বা কি! আমারতো বিষয়গুলো জানতে হবে! ১১টা ৫৫ তে মেইল আসলো। আমি টু-আইসি কে বললাম ‘তুমি পাওয়ার পয়েন্ট টা পেন ড্রাইভে নিয়ে কনফারেন্স রুমের ল্যাপটপে সেট করো, আমি যাই মিটিং এ। মিটিং এ দেখলাম প্রায় ৫০ টা দেশের অফিসার বসে আছে। ১০ টা দেশ প্রেজেন্টেশন দিবে। আমার সিরিয়াল ৩। আমার টু-আইসি বুদ্ধি করে প্রেজেন্টেশানের একটা প্রিন্টেড কপি আমার সামনে রাখলো যাতে আমি কিছুটা প্রস্তুতি নিতে পারি। কিসের প্রস্তুতি! সাবজেক্ট তো আমার না, আর সাবজেক্ট সম্পর্কে জানা না থাকলে যা হয়! ???? আমার হাটু কাঁপা শুরু হয়ে গেছে। ওরা হাটু কাঁপার দেখছেটা কি? আগে মঞ্চে যাই। এদিকে প্রথম দেশের বক্তব্য শেষে উপস্থিত অফিসারদের প্রশ্নবানে ওই ব্যক্তি জর্জরিত।

আমি বইপত্র বন্ধ করে একটা মন্ত্র পড়া শুরু করলাম ‘আমি বাংগালী মানে রয়াল বেংগল টাইগার আর আমার সামনে যারা বসে আছে তারা সব ভেরা।’ এই কথাটাই অন্তত ১০০ বার মনে মনে আওড়ালাম। আমার টার্ন এলো। পাওয়ার পয়েন্ট ওপেন করলাম। হেডিং দেখি আর মনের মাধুরী মিলিয়ে যা মনে হয় তাই বলি। ততক্ষনে হাটু কাঁপা বন্ধ হয়ে গেছে আমার। মন্ত্রের(!) কারনে কন্ফিডেন্সও বেড়ে গেছে। বক্তব্য শেষ…শুনি চারিদিকে হাত তালি। আমার টু-আইসি পরে এসে বলে কি দেখাইলেন স্যার without preparation! আমি বললাম প্রিপারেশন তো নিয়েছি। ওরা ভেরা আর আমি রয়্যাল বেংগল টাইগার। হাহ হাহ হাহ…
চলবে…….

মেজর মোহাম্মদ আহসান হাবিব (অবঃ)  এর ফেসবুক পোস্ট থেকে সংগ্রহীত।

বিজ্ঞাপন

BONOLOTA IT POS ads